মতামত

কাউন্সিলর হওয়া নয়, দায়িত্ব বোঝা জরুরি

-ফজলুল কবির মিন্টু

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর এবং ডঃ মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ধাপে ধাপে দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের মেয়র, কাউন্সিলর এবং চেয়ারম্যানদের অপসারণ বা বরখাস্ত করা হয়। এর ফলে বর্তমানে সারাদেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কার্যত জনপ্রতিনিধিহীন অবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম ও নাগরিক সেবার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর এখন সারাদেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, এই বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এমন এক প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম শহর এখন নির্বাচনী আমেজে মুখর। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার, মোড়ে মোড়ে ব্যানার, অলিগলিতে প্রচারণা—সব মিলিয়ে যেন এক উৎসবমুখর পরিবেশ। অনেকেই কাউন্সিলর হতে চান, নিজেকে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের সামনে থেকেই যায়—কাউন্সিলর হওয়া মানে কী? এটি কি কেবল একটি পদ, নাকি একটি গভীর দায়িত্ব?

বাস্তবতা হলো, স্থানীয় সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি নিয়ে অনেক সময় বাহ্যিক উৎসাহ বেশি দেখা যায়, কিন্তু দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা ততটা নয়। ফলে নির্বাচনের পর জনগণের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে একটি স্পষ্ট ফাঁক তৈরি হয়। এই ফাঁকই আমাদের নগর জীবনের নানা সমস্যার অন্যতম কারণ।

একজন কাউন্সিলর আসলে একটি ওয়ার্ডের মানুষের কণ্ঠস্বর। তিনি কোনো দপ্তরের কর্মকর্তা নন; তিনি জনগণের প্রতিনিধি। এলাকার মানুষের সমস্যা, চাহিদা, সংকট—সবকিছু তার মাধ্যমে সিটি কর্পোরেশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছানোর কথা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমাদের অনেক প্রার্থী কি সত্যিই মানুষের সংকট ও সমস্যা সমাধানকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে নিতে প্রস্তুত?

কাউন্সিলরের দায়িত্ব শুধু রাস্তা মেরামত বা ড্রেন পরিষ্কার করা নয়। এটি একটি সমন্বিত দায়িত্ব, যেখানে নাগরিক জীবনের প্রতিটি দিক জড়িত। একটি ওয়ার্ডের পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ—সবকিছুই তার নজরদারির আওতায় পড়ে। একজন দায়িত্বশীল কাউন্সিলর এসব বিষয়কে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখেন।

নগর পরিচালনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া। সিটি কর্পোরেশনের সভাগুলো কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এখানেই ঠিক হয় কোন এলাকায় কী উন্নয়ন হবে, কোথায় কত বাজেট বরাদ্দ হবে, কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একজন সচেতন কাউন্সিলরের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি নীরব থাকেন, তাহলে তার ওয়ার্ডও নীরব হয়ে যায়। আর যদি তিনি যুক্তি, তথ্য ও সাহসিকতার সঙ্গে কথা বলেন, তাহলে তার এলাকার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।

একজন কার্যকর কাউন্সিলরের আরেকটি বড় কাজ হলো তদারকি। উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার বাস্তবায়ন তার চেয়েও অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায়, কাজ হয় কিন্তু মান থাকে না; বাজেট বরাদ্দ হয় কিন্তু সঠিকভাবে ব্যবহার হয় না। এই জায়গায় কাউন্সিলরের সততা ও দায়িত্ববোধই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। অনিয়ম চিহ্নিত করা, সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রয়োজনে প্রতিবাদ করা—এসবই একজন প্রকৃত জনপ্রতিনিধির কাজ।

আমাদের নগর জীবনের বড় একটি সংকট হলো পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য। ডেঙ্গু, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—এসব সমস্যা শুধু প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত অবহেলার ফল। একজন সচেতন কাউন্সিলর এখানে নেতৃত্ব দিতে পারেন। তিনি যদি জনগণকে সম্পৃক্ত করেন, সচেতনতা বাড়ান এবং নিয়মিত তদারকি করেন, তাহলে একটি ওয়ার্ডকে স্বাস্থ্যসম্মত রাখা অসম্ভব কিছু নয়।

এছাড়া আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের করের অর্থ দিয়েই নগর পরিচালিত হয়। এই অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—তা জানার অধিকার জনগণের আছে। একজন সৎ কাউন্সিলর এই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন এবং জনগণের আস্থা অর্জন করেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কাউন্সিলর হওয়া মানে ক্ষমতা ভোগ করা নয়, বরং সেবা করা। এটি একটি দায়িত্বপূর্ণ অবস্থান, যেখানে ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সামষ্টিক স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। একজন প্রকৃত কাউন্সিলর নিজেকে নেতা হিসেবে নয়, সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

আজ যখন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সামনে, তখন প্রার্থীদের কাছে একটি সরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখতে হয়—আপনি কি একটি পদ চান, নাকি একটি দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত?

একইভাবে নাগরিকদের কাছেও প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি কেবল পোস্টার, প্রতিশ্রুতি আর ব্যক্তিগত সম্পর্ক দেখে ভোট দেব, নাকি প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা ও দায়িত্ববোধ বিবেচনা করব?

কারণ একটি শহর কেবল ইট-বালুর সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। একজন দায়িত্বশীল ও দক্ষ কাউন্সিলর সেই শহরকে বদলে দিতে পারেন—পরিচ্ছন্নতায়, সেবায়, পরিকল্পনায় এবং মানবিকতায়।

সুতরাং, সচেতন সিদ্ধান্তই পারে একটি বাসযোগ্য, উন্নত ও মানবিক নগর গড়ার পথ তৈরি করতে। কাউন্সিলর নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়; এটি আমাদের প্রত্যেকের নিজ নিজ ওয়ার্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

সবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে—একটি ভোট কেবল একটি ব্যালটের চিহ্ন নয়; এটি একটি ওয়ার্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের শক্তিশালী হাতিয়ার। সঠিক মানুষকে নির্বাচিত করা মানে শুধু একজন কাউন্সিলর বেছে নেওয়া নয়, বরং একটি দায়িত্বশীল, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক নগর ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলা। তাই আবেগ নয়, সচেতনতা; পরিচিতি নয়, যোগ্যতা; প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব সক্ষমতাকেই প্রাধান্য দিতে হবে। তাহলেই সম্ভব হবে এমন নেতৃত্ব নির্বাচন করা, যারা সত্যিকার অর্থে মানুষের পাশে দাঁড়াবে এবং যারা প্রত্যেকে নিজ নিজ ওয়ার্ডকে একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য ওয়ার্ডে রূপান্তরিত করবে।

(লেখকঃ বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলাকমিটির সাবেক সভাপতি এবং টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক)