চলমান সংবাদ

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দেশে তেলের কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কালোবাজারির অভিযোগে কঠোর নজরদারি

ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কালোবাজারির অভিযোগ জোরালো হওয়ায় কঠোর অবস্থানে গেছে সরকার। যদিও সরকার বলছে দেশে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, তবুও কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও ‘প্যানিক বায়িং’-এর কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পেট্রোল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের বিশেষ মনিটরিং, এবং ৯টি জেলার ১৯টি তেল ডিপোতে বিজিবি মোতায়েন করা হচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, যাতে তেল পাচার প্রতিরোধ করা যায়।

মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তেলের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি রোধে তথ্য দিলে পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকবে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, হঠাৎ করে তেলের চাহিদা বাড়ার পেছনে দুর্নীতি ও ব্ল্যাক মার্কেটিং রয়েছে এবং প্রশাসন সারাদেশে সক্রিয় রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দর এলাকায় প্রায় ছয় হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে। নাটোরের সিংড়ায় মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা প্রায় দশ হাজার লিটার তেল পাওয়া গেছে। শেরপুর, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় আবাসিক ভবন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থানে বিপুল পরিমাণ তেল মজুতের ঘটনা ধরা পড়েছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, পেট্রোল পাম্পে বড় পরিসরে তেল মজুতের সুযোগ নেই এবং বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার দায় পুরো খাতের ওপর চাপানো ঠিক নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যানিক বায়িং, দাম বাড়ার আশঙ্কা, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার গুজব এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের মজুতদারির প্রবণতা—এসব কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেছেন, সরবরাহে বড় সমস্যা না থাকলেও আস্থার সংকট থেকে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। প্রতিদিন স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

পড়ুন:  জ্বালানিসংকটে মহানগর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্লেন্ডেড ক্লাসের পরিকল্পনা

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের Special Powers Act, 1974 অনুযায়ী কালোবাজারি বা মজুতদারির অপরাধে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া ১৪ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানার ব্যবস্থাও আছে এবং আদালত মজুতকৃত পণ্য বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিতে পারে।

সরকার জনগণকে সতর্ক করে বলেছে, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের মতো জ্বালানি তেল অত্যন্ত দাহ্য হওয়ায় এগুলো ঘরে বা অনিরাপদ স্থানে মজুত করা ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পৃক্ততা না থাকলেও এর প্রভাবে বাজারে আতঙ্ক, কৃত্রিম সংকট এবং মজুতদারির প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার নজরদারি জোরদার করেছে এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছে।