চলমান সংবাদ

এনসিটি ইজারা চুক্তি বাতিলের দাবি জোরালো

-চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সংবাদ সম্মেলন

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে আধুনিক ও লাভজনক নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী ও অনৈতিক উল্লেখ করে তা অবিলম্বে বাতিলের দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ।

গত ২৯ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে এনসিটি ইজারা সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছে শ্রমিক-কর্মচারী সংগঠনগুলো। সংবাদ সম্মেলন, মশাল মিছিল, লাল পতাকা মিছিল, বন্দর অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই আন্দোলন বর্তমানে একটি সর্বজনীন জাতীয় আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করা হয়, ব্যাপক জনমত ও চলমান আইনি প্রক্রিয়া উপেক্ষা করে একটি অনির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গুরুতর আইনি জটিলতা ও চরম অনৈতিকতার মধ্য দিয়ে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। বিষয়টি বর্তমানে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকলেও সরকার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে বলে দাবি করা হয়।

সংগঠনের নেতারা জানান, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে—আগামী ১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অথচ এর মাত্র ১০ দিন পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এমন সংবেদনশীল সময়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণকে তারা নজিরবিহীন ও রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী বলে উল্লেখ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় মাত্র ১২ দিনের মধ্যে দরপত্র সংশোধন, কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন, দরকষাকষি, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং একাধিক সংস্থার অনুমোদনসহ পুরো কনসেশন প্রক্রিয়া শেষ করার যে সময়সূচি নির্ধারণ করেছে, তা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং সন্দেহজনক।

চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ এনসিটি ইজারার বিরোধিতায় ছয়টি মৌলিক কারণ তুলে ধরে জানায়—এটি কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়, পর্যাপ্ত দেশীয় সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি কোম্পানির কাছে টার্মিনাল হস্তান্তরের যৌক্তিকতা নেই, ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ, ৪০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি ইজারা জাতীয় বন্দর উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ, চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কার্যকর প্রতিকার অনিশ্চিত এবং একটি অনির্বাচিত সরকারের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো নৈতিক ও সাংবিধানিক বৈধতা নেই।

পড়ুন:  শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে রোড ম্যাপ ঘোষণার আহ্বাণ

সংবাদ সম্মেলনে অতীতের লালদিয়ার চর ও পানগাঁও বন্দর ইজারার উদাহরণ টেনে বলা হয়, সেসব ক্ষেত্রেও নজিরবিহীন দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যার ফলে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

নেতারা স্পষ্ট করে বলেন, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। জনগণের নির্বাচিত সংসদ ছাড়া জাতীয় সম্পদ সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এনসিটি ইজারা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত থাকলে দেশব্যাপী গণআন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়ে তারা বলেন, এর দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকেই বহন করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে আগামী কর্মসূচির ঘোষণাও দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে—বন্দর শ্রমিক দলের ডাকে ৩১ জানুয়ারি ও ১ ফেব্রুয়ারি কর্মবিরতিতে সর্বাত্মক সমর্থন এবং ১ ফেব্রুয়ারি সকাল ১১টায় বন্দর ভবন অভিমুখে কালো পতাকা সম্বলিত বিক্ষোভ মিছিল।

সংবাদ সম্মেলনে বন্দরসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক কাজি শেখ নুরুল্লাহ বাহার, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি এস কে খোদা তোতন, যুগ্ম সমন্বয়ক ও টিইউসি চট্টগ্রাম জেলার যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার কামাল খান, কাজী আনোয়ারুল হক হুনি, অ্যাডভোকেট ইম্রান হোসেন, আল কাদেরী জয়, হুমায়ুন কবির, ইব্রাহীম খোকন, ডক শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।