বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা(২৯): গণভোটে – ‘হ্যাঁ’ নাকি ‘না’

-বিজন সাহা

গত পর্বে আমরা প্রশ্ন রেখেছিলাম  মানুষ কেন রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করবে? আজ সেসব নিয়েই কথা বলব।

সামাজিক মাধ্যমে এরকম ক্লিপ দেখা যাচ্ছে যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তো অনেক দেখলেন, এবার জামায়াতকে ভোট দিয়ে দেখেন। এ রকম রিপোর্টও দেখা যাচ্ছে যে জামায়াত শিবির শ্রমজীবী মানুষকে আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে তাদের হয়ে প্রচার করার জন্য। এর মানে, তারা নির্বাচনে জেতার জন্য আদা জল খেয়ে মাঠে নেমেছে। এছাড়াও আছে প্রাশাসনিক শক্তি। যদি কেউ ভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের সহজেই টেক্কা দেয়া যাবে সেটা হবে ভুল ধারণা। তাই এই অপশক্তির বিরুদ্ধে খুব সতর্কতার সাথে মাঠে নামতে হবে।

মানুষকে বোঝাতে হবে যে জামায়াতকে নতুন করে দেখার কিছু নেই। একাত্তরেই তাদের চেহারা আমাদের চেনা হয়ে গেছে। শুধু একাত্তর কেন আশির দশক থেকে রগ কাটার রাজনীতি করে শিবির দেখিয়েছে যে তারা আল বদর, রাজাকারদের দেখানো পথ থেকে এক চুলও সরে আসেনি। তাছাড়া যদি বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকাই এই একই চিত্র আমরা দেখব। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে বলতে গেলে দেশ চালিয়েছে দুই দল – বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। ১৯৯১ – ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রথম টার্ম আর জামায়াতের সাথে আঁতাত করে ২০০১ – ২০০৬ পর্যন্ত দ্বিতীয় টার্মের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখব জামায়াতের উপস্থিতি শাসনকে কিভাবে সন্ত্রাসের দিকে ঠেলে দিয়েছে। একই কথা বলা চলে আওয়ামী শাসন সম্পর্কে। যখনই আওয়ামী লীগে হেলমেট বাহিনীর আগমন ঘটেছে তখনই ছাত্র লীগের সন্ত্রাস বেড়েছে। আজ তো নতুন করে বলার কিছু নেই কারা ছিল এই হেলমেট বাহিনী। এরা সবাই শিবিরের কর্মী যারা ছাত্র লীগে আত্মগোপন করে ছিল। এখানে যোগ করা যায় বিরোধী অবস্থায় তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড। রগ কাটার রাজনীতির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। ছাত্র রাজনীতিতে যে সন্ত্রাস তারা চালিয়েছে সেটা নতুন করে বলতে হবে না। যে সমস্ত ক্যাম্পাসে তারা ঘাঁটি গেড়েছে সেখানেই তারা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এর আগেও আওয়ামী লীগ বা বিএনপি বিরোধী দল ছিল, সেই অবস্থায় বিভিন্ন আন্দোলন, সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে যে ধরণের সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়েছিল সেখানে জামায়াত শিবিরের সিগনেচার স্পষ্ট। তাই জামায়াত শিবির যে সন্ত্রাসের আরেক নাম সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। এই সত্যটা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জনগণকে জানাতে হবে। জনগণ যাতে দুষ্ট লোকের মিষ্টি কথায় ভুলে নিজেদের বিপদ ডেকে না আনে সে ব্যাপারে তাদের সতর্ক করতে হবে।

এই যে গত দেড় বছরের মবতন্ত্র এটাও জামায়েত শিবিরের রাজনীতি। এখন তাও তো বেআইনি, গণভোটে হ্যাঁ বললে মোরাল পুলিশ তথা মব বৈধতা পাবে। জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা সাংবিধানিক ভাবে মবের শাসন চায় কি না? চাইলে তাদের আফগানিস্তান, ইরানের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে ভাল করে খেয়াল করতে হবে। আমার ধারণা বাংলাদেশের মানুষ এই পার্থক্য বুঝে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে এটা বোঝাতে পারে তাহলে তাদের সিরিয়াসলি গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিতে হবে। তারা প্রস্তুত কি? এখন দেশের সব রাজনৈতিক শক্তির সামনে এক বিরাট পরীক্ষা। তাদের শুভ বুদ্ধির উপর নির্ভর করবে বাংলাদেশ তার আইডেন্টিটি ধরে রাখবে না কি পাকিস্তানের মত ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

রাজনীতিবিদদের আরও মনে রাখতে হবে যে দেশের বর্তমান অবস্থার জন্য তারাই দায়ী। তারাই বার বার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার জন্য হয় অপরাজনীতি করেছে অথবা অপশক্তির সাথে হাত মিলিয়েছে। তারা ভুলে গেছে যে ক্ষমতার হাত বদল গণতন্ত্রের অংশ। মানুষ সব সময়ই আরও বেশি আশা করে। সেটা ব্যক্তি জীবনে যেমন, রাজনৈতিক বা সামাজিক জীবনেও তেমন। তাদের মনে হয় হয়তো অন্য কোন দল ক্ষমতায় থাকলে তাদের ভাগ্য আরও ভালো হত।
নদীর এপার কহে ছাড়িয়া নিঃশ্বাস
ওপারেতে যত সুখ আমার বিশ্বাস।
এটা মানব চরিত্র। তাই প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে ধ্বংস করে নয়, তাকে সঠিক ভাবে বিকাশের সুযোগ দিয়েই রাজনীতি করতে হবে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ধারণা পারম্পরিকতা মানে একটা দলের সব সময় ক্ষমতায় থাকা। সেটাই ভুল ধারণা। বিভিন্ন দল ক্ষমতায় এলেও দেশ রাজনৈতিক ভাবে স্থিতিশীল হতে পারে যদি রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, আর দলের চেয়ে দেশকে বড় মনে করে। সেক্ষেত্রে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাতে দেশের খোলনলচে বদলে যায় না। মানুষের জন্য যেমন, দেশের জন্যও তেমনি এই রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। একমাত্র তখনই দেশ বিকশিত হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের সব দলের শাসন যেন একেকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। একদল ক্ষমতায় এসে আগের সবকিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। যার ফলে দেশের উন্নয়ন ব্যহত হয়। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি যদি রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের বদলাতে শিক্ষা না দেয়, তাহলে বার বার দেশ এই ডিলেমার সম্মুখীন হবে – কে সে? কোনটা তার পথ?

পড়ুন:  বিজন ভাবনা (৯) স্বপ্নভঙ্গ -বিজন সাহা

তত্ত্ব প্রমাণ করা যায় না, সেটা শুধু ভুল প্রমাণ করা যায়। মানে কোন তত্ত্ব ততক্ষণ পর্যন্তই সঠিক যতক্ষণ না কেউ সেটা ভুল প্রমাণ করছে। তাই বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছু নেই, আছে নিখুঁত হবার অবিরাম সাধনা। একই কথা বলা যায় সত্যের ক্ষেত্রে। যুধিষ্ঠির জীবনে একবার মিথ্যা বলেই আর সত্যবাদী থাকতে পারেননি। একই ভাবে বলা যায় মুক্তিযোদ্ধা থাকতে হয় আজীবন, পদস্খলন করে মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার হতে পারে কিন্তু উল্টোটা ঘটে না। মৌলবাদ সম্পর্কেও একই কথা খাটে। এমনকি জীবনের সব ক্ষেত্রে মুক্তমনা থেকেও যদি কোন বিষয়ে কেউ অন্ধবিশ্বাসী হয়, সে আর মুক্তমনা থাকে না। এক্ষেত্রে সভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির কথা বলা যায়। সন্দেহ নেই যে সিপিএসইউ রাশিয়া তথা বিশ্বের জন্য প্রচুর প্রগতিশীল পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু ওয়ান পার্টি সিস্টেম তাকে মৌলবাদী করে তুলে। কারণ তারা ধরেই নেয় একমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। ওয়ান পার্টি সিস্টেম ছিল বলেই সিপিএসইউএর পতনের পরে দেশকে একত্রে রাখার কোন শক্তি ছিল না। শুধু তাই নয়, এর ফলে পার্টির ভেতরে ঘুণ ধরেছে, ভেতর থেকে সে পচতে শুরু করেছে। গণতন্ত্রের সাথে সমাজতন্ত্রের কোন দ্বন্দ্ব নেই, দ্বন্দ্ব আছে পুঁজিবাদের সাথে। একই ভাবে দেশের উন্নয়নের সাথে, সুশাসনের সাথে গণতন্ত্রের কোন দ্বন্দ্ব নেই। গণতন্ত্র শুধু ক্ষমতার হাত বদল করে না, সত্যিকারের গণতন্ত্র সব রাজনৈতিক দল ও সমাজকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করে। সেদিক থেকে গণতন্ত্র হল ভ্যাকসিন। তবে সেটা শুধু নির্বাচনের সময়ই চর্চার বিষয় নয়, এর চর্চা করতে হয় অবিরাম – পার্টির বাইরে যেমন তেমনি পার্টির ভেতরে, এমনকি পরিবারে, যাতে যেকোনো কালেক্টিভের যেকোনো সদস্য যেকোনো বিষয়ে তার মতামত প্রকাশ করতে পারে। তাই নির্বাচনের পরে ক্ষমতায় যারাই আসুক না কেন দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে হবে আর তা করতে হবে সরকারি, বিরোধী সব দল মিলেই।

কেন আমাদের গণতন্ত্র প্রয়োজন? কারণ গণতন্ত্রে প্রতিযোগিতা থাকে। আর প্রতিযোগিতা তখনই সম্ভব যখন প্রতিপক্ষ থাকে। সারভাইবাল অফ দ্য ফিটেস্ট মানে যারা দুর্বল তাদের ধ্বংস করা নয়, তাদের থেকে নিজেকে বেশি যোগ্য করে তুলে তাদের চেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা। যদি বাঘেরা বনের সব হরিণ খেয়ে ফেলে তাহলে অচিরেই নিজেরা অনাহারে মরবে। অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে ধ্বংস করলে রাজনীতি থাকবে না, আর রাজনীতি না থাকলে দল থাকবে না। তখন নিজের অস্তিত্ব বিপদের সম্মুখীন হবে। এক পায়ে খুব বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। একই ভাবে শুধু মাত্র একটি রাজনৈতিক দল থাকলে বিপদের সময় নির্ভর করার কেউ থাকে না। তাই যদি এই নির্বাচনে জামায়াত শিবিরের অশুভ শক্তিকে পরাজিত করা যায়, তাহলে প্রথম কাজ হবে স্বাধীনতার পক্ষের সমস্ত শক্তির বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা। এজন্য দেশে যেমন, দলের ভেতরেও গণতন্ত্রের চর্চা অনিবার্য।

আর গণভোটের ব্যাপারে বলব জনগণকে নিজেদেরকেই ঠিক করতে হবে কোথায় তারা কমা বসাবে – গণভোটে – হ্যাঁ, না না অথবা গণভোটে হ্যাঁ না, না।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো