ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন হবে রূপান্তরের নির্বাচন, সংসদই হবে ১৮০ দিনের সংবিধান সংস্কার পরিষদ: আলী রীয়াজ

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতের ১২টি নির্বাচনের মতো নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ও প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে, পাশাপাশি ১৮০ দিনের জন্য এটি ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ হিসেবেও কাজ করবে।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও সহিংসতা প্রতিরোধ: মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আলী রীয়াজ বলেন, “এই নির্বাচন ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যারা এটিকে অতীতের মতো সাধারণ নির্বাচন ভাবছেন, তারা ভুল করছেন। রাজনীতির বিশ্লেষক ও দলগুলো যদি এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “১৯৭২, ১৯৯১ ও ২০০৯ সালে গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সুযোগ এলেও রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় তা কাজে লাগানো যায়নি। এবারের অভ্যুত্থান সেই সুযোগ আবার সৃষ্টি করেছে।”
সংবিধান সংস্কার পরিষদের কারণে ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত হবে—এমন ধারণা নাকচ করে আলী রীয়াজ বলেন, “সংসদ প্রথম দিন থেকেই সরকার গঠন, দেশ পরিচালনা ও বাজেট প্রণয়নসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তবে ফ্যাসিবাদী প্রবণতা থেকে দেশকে বের করে আনতে বিদ্যমান সংবিধানে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে সংসদ সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার কাজ সম্পন্ন করবেন।”
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন সংবিধান সংস্কার আদালতে বাতিল না হয়, সে জন্য ত্রয়োদশ সংসদকে ‘কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার’ বা গণপরিষদীয় ক্ষমতা দিতে হবে। এটি কোনো অপ্রয়োজনীয় জটিলতা নয়, বরং স্থায়ী গণতন্ত্রের সুরক্ষাকবচ।
জুলাই জাতীয় সনদকে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার এবং জনগণের সঙ্গে একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, এটি অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব কোনো এজেন্ডা নয়; বরং ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে নয় মাসের আলোচনার ফল। এটিকে যদি ‘বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল’ হিসেবে দেখা হয়, তবে গণতান্ত্রিক রূপান্তর অসম্ভব হয়ে পড়বে।
প্রস্তাবিত গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতের মতো এটি ক্ষমতায় থাকার হাতিয়ার নয়। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার প্রতিশ্রুতিতে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না—তা জানার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, দলের সংস্কার বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না, এটি ভেতর থেকেই আসতে হবে। জুলাই অভ্যুত্থানে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি সংসদে নারীদের আসন ১০০-তে উন্নীত করা এবং সরাসরি মনোনয়নের হার বাড়ানোর বিষয়ে দলগুলোর ঐকমত্যের আহ্বান জানান।
গোলটেবিল আলোচনায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য ও সাবেক কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা বাংলাদেশে সহিংসতামুক্ত, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
