মতামত

ঘন কুয়াশায় জাহাজ বীচিং : শিপব্রেকিং শিল্পে বিপদের নতুন সংকেত

-ফজলুল কবির মিন্টু

গত ৪ জানুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত কে আর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে সংঘটিত এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় দুইজন জাহাজাঙ্গা শ্রমিক প্রাণ হারান। ‘কাসিয়া’ নামের একটি জাহাজ বীচিং করার সময় ঘন কুয়াশার মধ্যে জাহাজটির সঙ্গে একটি ছোট বোটের সংঘর্ষে এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এই দুর্ঘটনা শুধু দুটি জীবন কেড়ে নেয়নি, বরং শিপব্রেকিং শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থার গভীর সংকটকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, জাহাজটিকে বীচিং করতে সহায়তার জন্য দুটি ছোট বোট জাহাজের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। প্রতিটি বোটে চারজন করে মোট আটজন শ্রমিক ছিলেন। কুয়াশার কারণে জাহাজের ক্রু একটি বোটকে দেখতে না পাওয়ায় সংঘর্ষ ঘটে এবং ঘটনাস্থলেই দুইজন শ্রমিক নিহত হন। বাকি ছয়জন শ্রমিক সৌভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যান।

শিপব্রেকিং শিল্প দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কর্মক্ষেত্র। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালের আগে প্রতিবছর গড়ে ১৫ জন শ্রমিক এই খাতে নিহত হতেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমলেও দুর্ঘটনা ও আহত শ্রমিকের সংখ্যা বেড়েছে, যা নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত করে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অতীতে কখনো জাহাজ বীচিংয়ের সময় শ্রমিক নিহত হওয়ার নজির ছিল না। সেই জায়গা থেকে এই দুর্ঘটনা একটি নতুন ও বিপজ্জনক বাস্তবতার সূচনা করছে।

এই ঘটনার মূল কারণ হিসেবে ঘন কুয়াশার কথা বলা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এমন কুয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশে আদৌ জাহাজ বীচিং করা উচিত কি না। আধুনিক প্রযুক্তি, দৃশ্যমানতা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই যদি বীচিং কার্যক্রম চালু রাখা হয়, তবে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এ বিষয়ে শিল্প মন্ত্রণালয় ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট, বিজ্ঞানসম্মত ও বাধ্যতামূলক নির্দেশনা প্রণয়ন জরুরি।

দুর্ঘটনার পর আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে মালিকপক্ষের ভূমিকা। একটি সুস্পষ্ট দুর্ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে একে ‘ডাকাতির ঘটনা’ হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি নিহত দুইজন শ্রমিককে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাস্তবতা হলো—নিহত দুইজনসহ বেঁচে যাওয়া সকলেই ছিলেন ওয়্যার গ্রুপের শ্রমিক। এই ধরনের বিভ্রান্তিকর প্রচার কেবল দায়িত্ব এড়ানোর অপচেষ্টা নয়, শ্রমিকদের প্রতিও এক ধরনের অবমাননা।

পড়ুন:  কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ মহাপরিদর্শকের সাথে টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

যদি সত্যিই এটি ডাকাতির ঘটনা হয়ে থাকে, তাহলে একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরেই শিল্প পুলিশের একটি ফাঁড়ি রয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা কি কিছুই দেখেননি? কিছুই শুনতে পাননি? আর যদি এত বড় একটি ঘটনা শিল্প পুলিশের নজরের বাইরে ঘটে থাকে, তাহলে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় শিল্প পুলিশ বাহিনী পরিচালনার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

এ ক্ষেত্রেও শিল্প পুলিশের বক্তব্যে বিভ্রান্তি লক্ষ করা গেছে। কোথাও একে দুর্ঘটনা বলা হচ্ছে, আবার কোথাও মালিকপক্ষের বক্তব্যের বরাতে ডাকাতির কথা বলা হচ্ছে। একটি বাহিনীর পক্ষ থেকে এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য তদন্তকে দুর্বল করে এবং জনআস্থাকে ক্ষুণ্ন করে।

এই দুর্ঘটনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বীচিং কার্যক্রমের সময় নিরাপত্তা তদারকি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা তাদের দায়িত্ব কতটা পালন করেছে, তা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনার সবচেয়ে বড় সাক্ষী হচ্ছেন সেই ছয়জন শ্রমিক, যারা প্রাণে বেঁচে গেছেন। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে প্রশাসনের উচিত তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে স্বাধীনভাবে সাক্ষ্য দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা, যাতে কোনো পক্ষ ভয়ভীতি বা প্রলোভনের মাধ্যমে সত্যকে আড়াল করতে না পারে।

শিপব্রেকিং শিল্পে শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই পরীক্ষামূলক ঝুঁকির বিষয় হতে পারে না। এই দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে প্রাণহানি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করাই হবে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ভূমিকা।

(লেখকঃ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ -বিলস এর চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সমন্বয়ক)