বন্দর ইজারা নিয়ে বৈশ্বিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, গোপন চুক্তি বাতিল ও এনসিটি ইজারা বন্ধের আহ্বান

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো জাতীয় কৌশলগত সম্পদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র চলছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ। তিনি বলেন, এই ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়েছিল ১৯৯৭ সালে, যখন তৎকালীন সরকার এস এস কোম্পানিকে ১৯৮ বছরের জন্য বন্দর ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। সে সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং দেশের বিভিন্ন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান বন্দর ইজারা দেশের জন্য ভালো হবে বলে মত দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালেই হাইকোর্টে এস এস কোম্পানি একটি জালিয়াত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রমাণিত হয়।

তিনি বলেন, বর্তমানে গোপন চুক্তির মাধ্যমে লালদিয়ার চর ও পানগাঁও ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। আশঙ্কাজনকভাবে তখনকার সেই একই চক্র আজও বলছে, এসব উদ্যোগ নাকি দেশের জন্য মঙ্গলজনক। অথচ তাদের দেওয়া তথ্য যে মিথ্যা, তা আগেই প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং তাদের বক্তব্য বিশ্বাস করার কোনো সুযোগ নেই।

অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ আরও বলেন, অতীতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যে যুক্তি দেখিয়ে ফাইল তৈরি করা হয়েছিল, আজও সেই বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, যেহেতু বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যাচাই-বাছাই করেছে, তাই নতুন করে টেন্ডারের প্রয়োজন নেই। এখনো একই ধরনের কথা শোনা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, একটি স্বার্থান্বেষী বৈশ্বিক দুষ্টচক্র বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য বিভিন্ন কৌশলে তৎপর রয়েছে। এ বিষয়ে স্কপসহ দেশবাসীকে সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি লালদিয়ার চর ও পানগাঁওয়ের গোপন চুক্তি অবিলম্বে বাতিল এবং এনসিটির সঙ্গে কোনো ধরনের চুক্তি না করার দাবি জানান। পাশাপাশি তিনি বলেন, নির্বাচনী তফশিল ঘোষণার পর নৈতিকভাবে এই সরকারের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত চুক্তি করার কোনো এখতিয়ার নেই।

সভায় অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, বন্দর একটি জাতীয় সম্পদ এবং এই সম্পদ রক্ষায় জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতেও বন্দর নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছিল এবং তখন জাতীয় আন্দোলনের মাধ্যমেই বন্দর রক্ষা করা সম্ভব হয়েছিল। তিনি বলেন, কোনো গোপন চুক্তি দেশের মানুষ মেনে নেবে না। চুক্তির সব বিষয় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জনগণের সামনে আনতে হবে এবং লাভ-ক্ষতি ব্যাখ্যা করে জনগণের সম্মতি নিয়েই কেবল চুক্তি করা যেতে পারে।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকার দেশের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে যেসব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করছে, তাদের মুনাফা নিশ্চিত করতেই বন্দরের ট্যারিফ বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকার অপরিকল্পিতভাবে মাতারবাড়ি বন্দর নির্মাণ করছে এবং পাশাপাশি মোংলা বন্দরের উন্নয়ন করছে। এর ফলে ভবিষ্যতে লালদিয়ার চর ও এনসিটি হুমকির মুখে পড়তে পারে। এসব বিষয় সরকারকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনায় নিতে হবে।

আজ চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল খালেক হলে চট্টগ্রাম শ্রমিক ঐক্য পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত বন্দর বিষয়ক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব বক্তব্য তুলে ধরেন। জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লা বাহারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় আরও বক্তব্য দেন সিপিবির সাবেক সভাপতি কমরেড মোহাম্মদ শাহ আলম, টিইউইসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত, জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন, সিনিয়র সাংবাদিক জসিম চৌধুরী সবুজ,   এস কে খোদা তোতন, খোরশেদুল আলম, রবিউল হক শিমুল, আল কাদেরী পলাশ, জাহিদ উদ্দিন শাহিন, ইব্রাহীম খোকন, তসলিম হোসেন সেলিমসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।