মতামত

সমাজ সংস্কারক ও নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া

– লতিফা কবির

বাংলার মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর থানার পায়রাবন্দ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত অথচ রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহির উদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের ছিলেন রক্ষণশীল মনোভাবাপন্ন, আর মা রাহাতুন্নেসা সাবেরা চৌধুরানী ছিলেন তুলনামূলকভাবে উদার ও কুসংস্কারমুক্ত। ছয় ভাইবোনের পরিবারে বড় বোন করিমুন্নেসা এবং দুই ভাই ইব্রাহীম সাবের ও খলিলুর রহমান আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজের কুসংস্কার ও অন্ধতা উপলব্ধি করেন এবং রোকেয়ার শিক্ষার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

শিক্ষাগ্রহণে সংগ্রামী শৈশব

ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি শেখার প্রতি রোকেয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল। তৎকালীন সমাজে পর্দা প্রথা ও নারীর শিক্ষাবিরোধী মানসিকতা থাকায় তাঁকে গোপনে, রাতের অন্ধকারে মোমবাতির আলোয় পড়তে হয়েছে।
বড় ভাইয়ের কাছ থেকে ইংরেজি ও বড় বোন করিমুন্নেসার কাছ থেকে বাংলা শেখার সুযোগ পান তিনি। মাত্র আট বছর বয়সে বাড়িতেই তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে সাবলীল হয়ে ওঠেন। সামাজিক গঞ্জনা, আত্মীয়-স্বজনের বিরূপ সমালোচনা সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে শিক্ষার প্রতি তাঁর অদম্য আকাঙ্ক্ষাই তাঁকে এগিয়ে দেয়।

বিবাহ ও স্বামীর সহায়তা

১৬ বছর বয়সে রোকেয়ার বিয়ে হয় বিহারের ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার অধিকারী সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। তিনি নারীশিক্ষার অনুগত সমর্থক ছিলেন এবং রোকেয়ার মেধা বিকাশে সম্পূর্ণ সহায়তা করেন। তাঁর সহায়তায় রোকেয়া ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং নানা বই পড়ার সুযোগ পান।

কিন্তু বিবাহিত জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি—১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যু রোকেয়ার জীবনে গভীর দুঃখ বয়ে আনে। দুই কন্যা সন্তানও অকালেই মারা যায়। মৃত্যুর আগে স্বামী তাকে একটি মেয়েদের বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপদেশ দিয়ে যান, যা রোকেয়া আজীবন হৃদয়ে ধারণ করেন।

নারীশিক্ষা বিস্তারে অসামান্য ভূমিকা

১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর তিনি ভাগলপুরে পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল। কিন্তু স্বামীর প্রথম স্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে বিরোধের কারণে ১৯১০ সালে কলকাতায় চলে এসে ১৯১১ সালের ১৬ মার্চ আবার নতুন করে স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রায় দুই দশক অক্লান্ত পরিশ্রম, সামাজিক বিরোধিতা, সমালোচনা ও সীমাহীন প্রতিকূলতা অতিক্রম করে এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি মুসলমান নারীদের শিক্ষার অন্যতম প্রধান ঠিকানায় পরিণত করেন। বাড়ি বাড়িতে গিয়ে মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর জন্য উৎসাহিত করতেন তিনি; পর্দাপ্রথা রক্ষায় স্কুলে যাওয়ার জন্য পর্দাবেষ্টিত ঘোড়ার গাড়ির ব্যবস্থাও করেন।

স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা থেকে শুরু করে বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফারসি, হোম নার্সিং, ফার্স্ট এইড, সেলাই, রান্না, শরীরচর্চা—সবকিছু শেখানো হতো। ১৯১৯ সালে তাঁর তীব্র দাবি ও প্রচেষ্টায় সরকার কলকাতায় মুসলিম মহিলা ট্রেনিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করে।

সাহিত্যচর্চা ও সামাজিক চিন্তা

রোকেয়ার সাহিত্যিক জীবন শুরু হয় ১৯০২–০৩ সালে। তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়—

  • নারী অধিকার,

  • বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা,

  • পর্দা প্রথা ও কুসংস্কারের সমালোচনা,

  • নারীর শিক্ষার অপরিহার্যতা,

  • নারী স্বাধীনতার সামাজিক বাস্তবতা।

তাঁর গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থসমূহ—
মতিচুর (দুই খণ্ড), সুলতানা’স ড্রিম, পদ্মরাগ, অবরোধবাসিনী।

১৯০৫ সালে রচিত Sultana’s Dream ছিল নারীর ক্ষমতায়ন, বিজ্ঞানচর্চা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, নগর পরিকল্পনা এবং শান্তিপূর্ণ সমাজের স্বপ্নে ভরপুর এক সাহসী কল্পলোক—যা সেই সময়ের নারীর অবস্থানের প্রেক্ষিতে ছিল বিপ্লবী সৃষ্টি।

নারী আন্দোলনে নেতৃত্ব

১৯১৬ সালে রোকেয়া প্রতিষ্ঠা করেন আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম বা মুসলিম মহিলা সমিতি। মুসলিম নারীদের উন্নয়ন, শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, বিধবা সহায়তা, অনাথদের পুনর্বাসন—সবক্ষেত্রেই এ সমিতি কার্যকর ভূমিকা রাখে। সমাজের রক্ষণশীল অংশের সমালোচনা ও বাধা সত্ত্বেও রোকেয়া তাঁর লক্ষ্যচ্যুত হননি।

রোকেয়ার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি

নারীকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে তাঁর লেখাগুলো ছিল অত্যন্ত জোরালো। তিনি বলেছিলেন—

“আমরা পশু নই, আসবাবপত্র নই—আমরা মানুষ।”
“শিক্ষার অভাবে আমরা স্বাধীনতা লাভের অযোগ্য হয়ে পড়েছি।”

নারী-পুরুষের সম অধিকার, বিবাহ-বিচ্ছেদে সমান অধিকার, নারীশিক্ষা, সামাজিক ন্যায়—এসব বিষয়ে তিনি সময়ের তুলনায় বহু অগ্রসর ছিলেন। আজও তাঁর বক্তব্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

উত্তরাধিকার ও স্মৃতি

রোকেয়ার কর্মধারা ও আদর্শ বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ভিত্তি রচনা করেছে। তাঁর স্মরণে রংপুরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, এবং সরকার চালু করেছে বেগম রোকেয়া পদক

তবে শুধুমাত্র পদক প্রদানের মাধ্যমে নয়—বরং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনে তাঁর আদর্শকে ধারণ করে রোকেয়া দিবস পালন করা এবং নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় অব্যাহত সংগ্রাম চালানোই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।

জীবনের অবসান

নারীর মুক্তি ও শিক্ষা বিস্তারের সারথি বেগম রোকেয়া ১৯৩২ সালের ৯ ডিসেম্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। মৃত্যুর দিনটিও তিনি বেছে নিয়েছিলেন জন্মদিনের মতোই অর্থবহ।

বেগম রোকেয়া আজও আমাদের প্রেরণা—অন্ধকার থেকে আলোয়, অন্যায় থেকে ন্যায়বিচারে, দাসত্ব থেকে মুক্ত মানবতার পথে পথচলার অনুপ্রেরণা।

(লেখকঃ সভাপতি, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, চট্টগ্রাম জেলা শাখা)