জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনার প্রতিবাদে স্মারকলিপি প্রদান -দ্রুত নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার নিশ্চিত এবং সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের দাবি ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের

আজ দুপুর ১২টায় চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহাবুবুল হাসানের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেছে জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরাম। গতকাল সীতাকুণ্ডের বার আউলিয়ায় অবস্থিত জিরি সুবেদার শিপ ইয়ার্ড-এ অগ্নি দুর্ঘটনায় ৮ জন শ্রমিক আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত, যুগ্ম আহ্বায়ক এ এম নাজিম উদ্দিন, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শেখ নুরুল্লাহ বাহার, ফোরামের সদস্য শ ম জামাল উদ্দিন, কোষাধ্যক্ষ রিজওয়ানুর রহমান খান, সদস্য নুরুল আবসার, জাহাজভাঙা শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ক তথ্য কেন্দ্রের সমন্বয়ক ফজলুল কবির মিন্টু, শ্রমিক সেফটি কমিটির আহ্বায়ক এডভোকেট জহির উদ্দিন মাহমুদ, সদস্য সচিব মোহাম্মদ আলী, যুগ্ম সদস্য সচিব মোঃ ইদ্রিস এবং সদস্য জামাল উদ্দিন প্রমুখ।
নেতৃবৃন্দ জানান, গত ২৬ জুন থেকে হংকং কনভেনশন বাধ্যতামূলক হওয়ার পর মাত্র আড়াই মাসে ১৩টি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশে ১৭টি গ্রিন ইয়ার্ড এবং কিছু ট্র্যাডিশনাল ইয়ার্ড চালু থাকা সত্ত্বেও এই দুর্ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে।
শ্রমিক নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, এত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেও হতভাগ্য শ্রমিকরা সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি পাচ্ছে না। শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের জন্য সর্বোচ্চ ৪০০ টাকা মজুরি পান, অথচ মালিকপক্ষ গত ডিসেম্বরে ওয়াদা করেছিল যে, ২০২৫ সাল থেকে ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি।
গতকালের (১৬ সেপ্টেম্বর) দুর্ঘটনায় জাহাজ কাটার সময় আগুনের স্ফুলিঙ্গ পাশের ইঞ্জিন রুমে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটে, এতে ৮ জন শ্রমিক আহত হন। এদের মধ্যে ২ জনের শরীরের ২০% দগ্ধ হয় এবং বাকি ৬ জন হাতে-পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। আহতদের মধ্যে ৩ জনকে সাগরিকা গ্রীন শিপা হাসপাতালে এবং বাকি ৫ জনকে মেহেদীবাগ ন্যাশনাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের চিত্র তুলে ধরে ফোরামের অভিযোগ:
ফোরাম নেতারা অভিযোগ করেন, এই দুর্ঘটনাগুলোর মূলে রয়েছে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের ধারাবাহিকতা, যেমন:
শ্রমিকদের নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র সরবরাহ করা হয় না,
ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন হয়নি (বর্তমানে সর্বোচ্চ দৈনিক ৪০০ টাকা),
সবেতন ছুটির ব্যবস্থা নেই, চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল,
দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা বা ফলোআপ নেই,
নিহতদের পরিবারকে শ্রম আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও, জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা অধীনে ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তি অনিশ্চিত,
অধিকাংশ শ্রমিক ঠিকাদারের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় অধিকার আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়।
ফোরামের ৮ দফা দাবি:
১. প্রতিটি ইয়ার্ডে বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, পিপিই সরবরাহ এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
২. শ্রমিকদের নিয়োগপত্র, পরিচয়পত্র ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা।
৩. ন্যূনতম মজুরি ও উৎসব বোনাস বাস্তবায়ন করা।
৪. দুর্ঘটনার পর সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
৫. আহত ও নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
৬. স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবেলায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৭. হংকং কনভেনশনের বাস্তবায়ন শ্রমিক সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে করা।
৮. ঠিকাদারি প্রথায় শ্রমিক নিয়োগ বাতিল করা।
ফোরাম নেতৃবৃন্দ জোর দিয়ে বলেন, হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নের নামে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে হবে না; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হবে, যখন শ্রমিকের জীবন ও অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
