বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা (৩৭): শিক্ষা 

-বিজন সাহা

কিছুদিন আগে যখন দেশের নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাম দলের ভূমিকা নিয়ে লিখি এক বন্ধু মন্তব্য করল যে দেশের বর্তমান পরস্থিতির জন্য দায়ী শিক্ষিত মানুষের অভাব।

আমাদের দেশ তো বটেই, সব দেশেই একটি গড়পড়তা ধারণা আছে যে সমস্ত নষ্টের মূলে রয়েছে শিক্ষার অভাব। সত্যিই কি তাই? একাত্তরে যুদ্ধ করেছিল মূলত চাষাভুষা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও বিপক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিল শিক্ষিত মানুষ। এই যে দেশটা রসাতলে গেল সেটাও তো শিক্ষিত মানুষদের হাত ধরেই। ডঃ আলী রিয়াজ, ডঃ সলিমুল্লাহ খান, ডঃ আসিফ নজরুল, ডঃ ইউনুস – এদের শিক্ষার ঘাটতি আছে? সোভিয়েত ইউনিয়ন বা নতুন রাশিয়ায় দেখেছি, দেখছি এই শিক্ষিত মানুষই অল্পে তুষ্ট হতে না পেরে দেশ তথা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আসলে দেশের প্রতি, মানুষের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে শিক্ষা দিয়ে কিছু হয় না। এই ভালোবাসা জাগাতে পারে দেশীয় সংস্কৃতি। ‌দেশের আলো হাওয়ায় যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে হাজার বছর ধরে সেটাকে বর্জন করে যে শিক্ষা তা কখনোই পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা নয়। দেশপ্রেম মানে দেশের মাটি, মানুষ, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ভালোবাসা, তা ধারণ করা। শিক্ষার ফলে হয়তো ধর্ম নিয়ে গোঁড়ামি কমে কিন্তু অন্যদিকে অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে গোঁড়ামি বাড়ে। ফ্যাসিবাদ, কনসেনট্রেশন ক্যাম্প, বর্তমানের রুশ ফোবিয়া যা এমনকি তলস্তই, দস্তইয়েফস্কি, চাইকোফস্কিকে নিষিদ্ধ করে – এসবের জন্ম শিক্ষিত ইউরোপে। মানুষ তার লোভ লালসাকে জাস্টিফাই করতে কোন না কোন কিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস করবে, কাউকে না কাউকে অন্ধভাবে ঘৃণা করবে। সত্যিকারের সংস্কৃতিবান মানুষ এক্ষেত্রে অনেক উদার। যখনই কেউ নিজেকে অন্যের চেয়ে সুপেরিয়র মনে করে তখনই সমস্যা দেখা দেয়।

গল্পটি আমি একাধিক বার বলেছি, তবুও বলি—
যখন সেভার বয়স পাঁচ, ও আমাকে ভায়োলিন ক্লাস থেকে ফেরার পথে জিজ্ঞেস করল,
“পাপা, আমাদের দুজনের মধ্যে কে বেশি বুদ্ধিমান?”
তখন তেমন কিছু না ভেবেই বলেছিলাম,
“তুই বেহালা বাজাতে পারিস, আমি পারি না। তাই বেহালা নিয়ে কথা হলে তুই। আমি এখন তোর চেয়ে ভালো অংক কষি। অংক নিয়ে বললে আমি। আসলে যেকোনো লোক কোন না কোন বিষয়ে অন্যের চেয়ে দক্ষ”।

সেদিন এ কথা বলার সময় তেমন করে ভাবিনি। কেন যেন মাথায় এল, বলে ফেললাম। পরে বুঝেছি এর গুরুত্ব। আমরা যখন স্বীকার করব যে প্রতিটি মানুষই কোন না কোন বিষয় আমার চেয়ে ভালো জানে তখনই তাকে শ্রদ্ধা করতে শিখব। কোন মানুষের প্রতি অবজ্ঞা আসে যখন নিজেকে তার চেয়ে উঁচু মনে করি।
শিক্ষাহীনতার সাথে আমরা প্রায়ই ধর্ম যোগ করি। ভাবখানা এই যেন স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা না করলেই মানুষ ধার্মিক হয়ে যায়, মানে ধর্ম মানা না মানা একান্তই শিক্ষার উপর নির্ভর করে। ধর্ম শুধু পূজা পার্বণ বা নামাজ রোজা নয়, ধর্ম হল কোন কিছুর ক্ষমতায় অন্ধ বিশ্বাস। সোভিয়েত ইউনিয়নে অধিকাংশ মানুষ প্রথাগত ধর্মে বিশ্বাস না করলেও অনেকেই লেনিনকে ঈশ্বর বলে মনে করত। সেখানে রাস্তার মোড়ে মোড়ে লেনিনের মূর্তি দেখে আমি সোভিয়েত বন্ধুদের ঠাট্টা করে বলতাম, এ যে দেখছি ভারতে শিব লিঙ্গের মত। আমার ৪২ বছরের সোভিয়েত ও রুশ জীবনের উপলব্ধি হল ম্যাটেরিয়াল লাইফের পাশাপাশি অধিকাংশ মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন প্রয়োজন। অর্থাৎ এমন কিছু তার দরকার যেখানে সে মানসিক শান্তি পায়। এটা যে শুধু ধর্ম বা ঈশ্বর তা কিন্তু নয়, হতে পারে সঙ্গীত, সাহিত্য, গণিত, পদার্থবিদ্যা, ফোটোগ্রাফি বা অন্য কিছু। আর এজন্য শিক্ষা হওয়া উচিত সংস্কৃতি কেন্দ্রীক। এটাই মনে হয় মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে। পেটের পাশাপাশি তার দরকার মনের খোঁড়াক। আর এই সুযোগ গ্রহণ করে মানুষকে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতে দীক্ষিত করে। তাই বিজ্ঞান প্রযুক্তির পাশাপাশি শিক্ষা হতে হবে নিজের দেশ, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সেসবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সোভিয়েত ইউনিয়নে তাদের অতীতকে ঘৃণা করতে শেখানো আমার মতে ছিল ভুল। কারণ জারকে বা জারের শাসনকে ঘৃণা করার পাশাপাশি তাদের ভালমন্দ সব কিছুই ঘৃণ্য হয়। কিন্তু এটা মানতেই হবে এর মধ্যেও সমাজ টিকে ছিল, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলছিল। সবই যদি এতই খারাপ হত তাহলে তো টেকার কথা ছিল না। অতীতের ভুল আমরা ঠিকই আলোচনা করব, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন সমাজ গড়ব, কিন্তু তাকে অস্বীকার করে নিজের অস্তিত্বকেই যেন অস্বীকার করে না বসি। এই ঘৃণার হাত ধরেই প্রথমে স্তালিন (স্ট্যালিন), পরে খ্রুশেভ (ক্রুশ্চেভ) আর শেষে সমাজতন্ত্রের প্রতি ঘৃণার জন্ম। নিজের দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্ব ঘৃণা করতে করতে একসময় দেশটার প্রতি ভালোবাসা থাকে না। বর্তমানে রাশিয়ার মানুষের মধ্যে দেশের প্রতি নতুন করে ভালবাসা জাগার একটি প্রধান কারণ জারের রাশিয়া, সোভিয়েত ইউনিয়ন আর বর্তমান রাশিয়ার প্রতি সমান মনোযোগ দেয়া, স্বীকার করা যে ভালো হোক, মন্দ হোক এটাই আমাদের ইতিহাস, এটাই আমাদের ভিত্তি। আমরা আমাদের ইতিহাসের দিকে একটু খেয়াল করলেই দেখব কেন আজকের প্রজন্মের একটি  বিরাট অংশ দেশকে ঠিক সেভাবে ভালবাসে না। অনেকক্ষেত্রে যৌক্তিক কারণেই এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রতি বিদ্বেষ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। পরে অতি সুক্ষ ভাবে সেই আওয়ামী বিদ্বেষ থেকে একাত্তরের প্রতি ঘৃণা ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। আজ চব্বিশকে একাত্তরের চেয়ে বড় করে দেখার একটা কারণ কোন আমলকে ঘৃণা করতে শেখানো। আর পরে সেই আমলের সাথে সাথে ঘৃণা করছে দেশের মূল ভিত্তিকে। ঘৃণা খুবই সংক্রামক। একবার এই অসুখ পেয়ে বসলে মানুষ সব কিছুই ঘৃণা করতে শুরু করে। তাই শুধু শিক্ষিত হলেই হবে না, কী শিক্ষা পাচ্ছে মানুষ সেটা দেখতে হবে। ১৯৭১ সালে দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা মনে হয় ১০ থেকে ১৫% মত ছিল। এখন তো সেটা বেড়ে ৮০% এর কাছাকাছি। মানে শিক্ষিত মানুষের পরিমান বেড়েছে, কিন্তু তাদের মান বেড়েছে কি? কোয়ান্টিটি এখানে কোয়ালিটিতে পর্যবসিত হয়নি মার্ক্সের সূত্র মেনে। আর এ কারণেই মনে হয় এক বন্ধু প্রশ্ন তুলেছে

কেন আমাদের ডিগ্রিধারীদের এক বিরাট অংশ প্রায় অশিক্ষিত থেকে গেছেন?
এর উত্তর বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে দেবে। এ নিয়ে আমার ভাবনাগুলো এরকম –
এসব ডিগ্রিধারী মানুষেরা বোঝে না যে তারা অশিক্ষিত। তাদের কাছে শিক্ষা মানে ডিগ্রি অর্থাৎ অন্যের স্বীকৃতি। আর সেই স্বীকৃতি সবসময় যোগ্য লোকের স্বীকৃতি নয়। এ প্রসঙ্গে আমরা সেই “আই ডোন্ট নো – আমি জানি না” গল্পটি মনে করতে পারি। এ ধরণের শিক্ষিত মানুষের কাছে জনতার সমর্থন বড়, তাই তারা হাওয়া বুঝে অবলীলায় মিথ্যা বলে যায়। আর বলে ইচ্ছাকৃত ভাবে। এটাই সবচেয়ে মারাত্মক। কারণ ২৬ লক্ষ ভারতীয় বা এই জাতীয় কথা শুনে মানুষ তো বটেই এমনকি গরু ছাগল পর্যন্ত হাসে। এরা এভাবে শুধু শিক্ষিত মানুষকে নয়, শিক্ষাকেই হাস্যকর করে তোলে। সত্যিকারের শিক্ষা মানে ডিগ্রি বিক্রি করে জনগণকে বিভ্রান্ত করা নয়, সত্যিকারে শিক্ষা মানে নিজেকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, সত্যের সন্ধান করা। লেখাপড়া করার মূল উদ্দেশ্য জানা – জানা মানে জ্ঞান অর্জন করা। তবে আমরা “লেখাপড়া করে যে জ্ঞান অর্জন করে সে” এই মন্ত্র জপি না। আমাদের মন্ত্র “লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।” ভুল উদ্দেশ্য নিয়ে ডিগ্রি পেলে এর চেয়ে বেশি কী আমরা আশা করতে পারি? শিক্ষা সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি মনে হয় এর অন্যতম প্রধান কারণ।

পড়ুন:  বিজন ভাবনা(৩৬): বঙ্গবন্ধু   -বিজন সাহা  

আসলে শিক্ষা কী বা শিক্ষার লক্ষ্য কী সেটার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে। পৌরাণিক কাহিনী থেকে জানা যায় সেই সময়ে ভারতবর্ষে শিক্ষার্থীরা গুরুর আশ্রমে থেকে লেখাপড়া করত। তারা শুধু শাস্ত্র আলোচনা করত না, সেই সাথে যুদ্ধ, কৃষিকাজ ও অন্যান্য গার্হস্থ্য কাজে পারদর্শী হয়ে বাড়ি ফিরত। আমাদের ছোটবেলায়, যখন ভোকাশনারি শিক্ষা তেমন ছিল না, অনেকেই হাতেনাতে কাজ শিখতে ওস্তাদের কাছে। সেটা হতে পারে সেলাই, কামার, কুমার, ক্ষৌর কার্য, তাঁত শিল্প, কৃষি কাজ। আর এসব ক্ষেত্রে ডিগ্রি ছিল না, ছিল দক্ষতা। মানে দর্জির কাছে কেউ তার ডিগ্রি দেখতে চাইত না, দেখত তার কাজ, তার সেলাই। একই কথা বলা যায় অন্যান্য পেশার ক্ষেত্রেও।
অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল চাকরি কেন্দ্রিক। ইংরেজ শাসনামলে প্রথমে তারা কেরানি বা আমলা তৈরির দিকে মনোযোগ দেয়। এমনকি সেই সময়ের জনপ্রিয় ব্যারিস্টারি শিক্ষাও শাসনতন্ত্রের সাথে জড়িত। বিজ্ঞান নিয়ে যারা লেখাপড়া করেছেন তারা করেছেন নিজেদের রিস্কে। সময়ের সাথে সাথে সমাজ বিবর্তিত হয়েছে, বেড়েছে স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। তবে যেভাবে সবাই বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেয় তাতে মনে হয় সবার লক্ষ্য একটাই – সরকারি চাকরি পাওয়া। অস্বীকার করব না যে মানুষের প্রধান চাহিদা নিরাপত্তা, আর চাকরি মানে উপার্জনের নিশ্চয়তা সেই নিরাপত্তার একটি অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। কোনটি মানুষকে বেশি টানে – চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা নাকি ভালো উপার্জন করা? প্রশ্ন আসতেই পারে ভালো চিকিৎসা করলে ভালো উপার্জন করতে সমস্যা কোথায়? কিন্তু গাড়ি বাড়ি এসবই যখন বেশির ভাগ মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হয় তখন তারা সার্বিক ভাবে শিক্ষিত হবার সময় বা উৎসাহ কোথায় পাবে? শিক্ষিত মানুষ মানে চিন্তাশীল মানুষ, সে শুধু রবোটের মত তার পেশাগত কাজটিই ভালো করবে না, সে বিভিন্ন মানবিক গুণের অধিকারী হবে। কিন্তু যখন মানবতার বাজার মন্দা তখন মানুষ শিক্ষিত হয়ে কি করবে? আমরা অধিকাংশ মানুষ অন্যদের জনদরদী, সমাজ সেবী দেখতে চাই, আর নিজেদের ছেলেমেয়েদের দেখতে চাই অঢেল অর্থ উপার্জনকারী হিসেবে। এটা সামাজিক ব্যাধি। বিশেষ করে ভোগবাদী সমাজে এটা খুবই সংক্রামক। আমরা অন্যের প্রতি সমবেদনা বা সহমর্মিতা প্রকাশ করার চেয়ে করুণা দেখাতে বেশি পছন্দ করি। কারণ অন্যকে করুণা করে নিজেকে বড় মনে করা যায়, সহমর্মিতা প্রকাশের জন্য সমান বা ছোট হতে হয়। মানুষের কথা কী বলব যখন ঈশ্বর নিজে করুণাময় হয়েছেন কিন্তু মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করতে পারেননি।

এর থেকে বেরুনোর উপায় কি? কাজের মর্যাদা দিতে শেখা। বোঝা যে ছোট কাজ, বড় কাজ বলে কিছু নেই, সব কাজই সমান ভাবে দরকার। সমাজ অনেকটা দলগত খেলা। ক্রিকেটে ওপেনার, মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান, উইকেট কিপার, অলরাউন্ডার, পেসার ও স্পিনার থাকে। ফুটবলে গোলকিপার, ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার, স্নাইপার এসব থাকে। সবার নিজ নিজ দায়িত্ব থাকে। তারা সেটাই পালন করে। সমাজেও তাই। এখানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক ইত্যাদি হাজারটা পেশার মানুষ থাকে। এদের কাউকে বাদ দিয়ে সমাজ সুস্থ হতে পারে না। আবার সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজের জন্য প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্য কর্মী দরকার। কৃষক যেমন চিকিৎসা সেবা দিতে পারবে না, ডাক্তার তেমনি ফসল ফলাতে পারবে না। কিন্তু তাদের দু’জনারাই দু’জনকে দরকার। সমস্যা হল, এই কথা অশিক্ষিত কৃষক যতটা বোঝে শিক্ষিত ডাক্তার ততটা বোঝেন না। কৃষক ডাক্তারকে সমীহ করে, ডাক্তার কৃষককে অবজ্ঞা করেন। ডিগ্রীধারী আর ডিগ্রীহীন মানুষের মধ্যে এভাবেই সৃষ্টি হয় দুরত্ব – পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস। আর এখান থেকে সৃষ্টি হয় সামাজিক বৈষম্য। যতদিন পর্যন্ত কাজের বর্ণ বৈষম্য থাকবে, ডিগ্রীধারী লোক স্কুলে না পড়া লোকদের ঠকাতে পারবে ততদিন ডিগ্রীধারী লোকদের একটা বিরাট অংশ অশিক্ষিতই থেকে যাবে। এই সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তির উপায় সমাজ ভাবনার আমুল পরিবর্তন।

সত্যিকারের শিক্ষিত কাক তার কাকরূপী দেহ নিয়ে চিন্তিত নয়, শিক্ষার আলোকে মনকে আলোকিত করে মানুষ হওয়া তার লক্ষ্য। ডিগ্রি সর্বস্ব কাক ব্যস্ত নিজেকে ময়ূর রূপে জনসমক্ষে হাজির করতে। ফলে দিনের শেষে সে অশিক্ষিত কাকই থেকে যায়। এটা আসলে নিজেকে চেনার বা বোঝার সমস্যা, অস্তিত্ব সংকট। সক্রেটিস তো এমনি এমনি নিজেকে চেনার জন্য বলেননি। যে জাতি এখনও বিশ্বের বুকে তার পরিচয়পত্র নথিবদ্ধ করতে পারল না, সে বাঙালি না মুসলমান না বাংলাদেশী মুসলমান না মুসলমান বাংলাদেশী এই প্রশ্নের সর্বজন গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজে পেল না তার ডিগ্রীধারী সন্তানদের একটি বড় অংশ যে অশিক্ষিত রয়ে গেল তাতে তাই অবাক হবার কী আছে?

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো