জঙ্গল সলিমপুরে সর্ববৃহৎ সাঁড়াশি অভিযান, আটক ১৫; অস্ত্র উদ্ধার, স্থাপন হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্যাম্প

চট্টগ্রামের ইতিহাসে সন্ত্রাস দমনে পরিচালিত সবচেয়ে বড় সমন্বিত অভিযানে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানে অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে এবং উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ দেশি–বিদেশি অস্ত্র।
গতকাল সোমবার ভোর থেকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় শুরু হওয়া এই সাঁড়াশি অভিযানে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আকাশ ও স্থলপথে নজরদারি চালানো হয়। প্রায় চার হাজার সদস্যের অংশগ্রহণে পরিচালিত এই অভিযানে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সদস্যরা অংশ নেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সোমবার ভোর ৫টা থেকে অভিযান শুরু হয়। এতে প্রায় ৫৫০ জন সেনা সদস্য, ১ হাজার ৮০০ পুলিশ সদস্য, ৩৩০ জন এপিবিএন সদস্য, ৪০০ র্যাব সদস্য এবং ১২০ জন বিজিবি সদস্য অংশ নেন। অভিযানের সময় ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর চারটি সাঁজোয়া যানসহ বড় একটি বাহিনী মোতায়েন করা হয়। সকাল ১০টার পর থেকে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে আকাশপথে নজরদারি জোরদার করা হয়। পাহাড়ি ঝোপঝাড় বা মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা অস্ত্র ও বিস্ফোরক শনাক্তে ডগ স্কোয়াডও কাজে লাগানো হয়।
বেলা ১১টার দিকে বায়েজিদ লিংক রোড এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান। তিনি জানান, সন্ত্রাসীদের আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে এবং অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, তবে অভিযানের শেষে বিস্তারিত জানানো হবে।
পরে ‘ছিন্নমূল মুখ’ এলাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র হয়ে ওঠা জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।” পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এলাকায় পুলিশ ও র্যাবের দুটি ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন জানান, ভোর থেকে অভিযান চলছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার হয়েছে কি না বা কত অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে, তা জানানো হয়নি।
অভিযানে নানা প্রতিবন্ধকতা
অভিযানের খবর পেয়ে সন্ত্রাসীরা আগেই বিভিন্ন স্থানে রাস্তা বন্ধ করে দেয় বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কোথাও বড় ট্রাক রেখে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়, আবার কোথাও কালভার্ট ভেঙে ও নালার স্ল্যাব খুলে ফেলা হয়, যাতে বাহিনীর যানবাহন ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। পরে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ট্রাক সরিয়ে এবং ভাঙা কালভার্ট ইট–বালু দিয়ে ভরাট করে ভেতরে প্রবেশ করেন।
দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসী আস্তানা
প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত জঙ্গল সলিমপুর নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে দীর্ঘদিন ধরে এটি অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।
বর্তমানে সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার বাড়িতে অন্তত দেড় লাখ মানুষের বসবাস রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে এবং এখনো পাহাড় কেটে চলছে প্লট বাণিজ্য। এই দখল ও বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে এলাকায় সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে ওঠে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এলাকায় বর্তমানে দুটি সন্ত্রাসী পক্ষ সক্রিয়। একটি পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন মোহাম্মদ ইয়াসিন এবং অপর পক্ষের নেতৃত্বে রোকন উদ্দিন।
ইয়াসিন চলতি বছরের জানুয়ারিতে র্যাব সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার প্রধান আসামি। ওই হামলায় মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নামে র্যাব–৭ এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) নিহত হন এবং কয়েকজন র্যাব সদস্য আহত হন। মামলায় ইয়াসিনসহ ২৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও প্রায় ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, অভিযানের বিষয়ে আজ বিস্তারিত তথ্য জানাতে ডিআইজি পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক ব্রিফিং করা হবে।
