মতামত

নতুন অধ্যায়, কঠিন পরীক্ষা: বিএনপি’র নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর করণীয়

-ফজলুল কবির মিন্টু

দেশের সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নিরঙ্কুশ বিজয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। অনেকের কাছে এটি ২০০৮ সালের নির্বাচনের এক উল্টো প্রতিচ্ছবি—সেইবার জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, আর এবার প্রত্যাশিতভাবেই বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে বিএনপি। প্রাপ্ত তথ্যমতে, দলটি ২১২টি আসনে জয় পেয়েছে, যা নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী গণসমর্থনের ইঙ্গিত বহন করে।

এই নির্বাচনে নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভূমিকা ছিল নীরব কিন্তু অত্যন্ত নির্ণায়ক। বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বার্তা অনেক নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারকে বিএনপির দিকে আকৃষ্ট করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর আমির পদে নারী মনোনয়নের বিধান নেই—এমন আলোচনা নারী ভোটারদের একটি অংশের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে বলেও রাজনৈতিক মহলে মত রয়েছে। বাস্তবে আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে ৩০০ আসনের বড় অংশ বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ভাগ হয়েছে। ফলে প্রত্যেক পক্ষই তাদের আগের অবস্থানের তুলনায় বেশি আসন পেয়েছে। তবে অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও প্রচারণার হাইপ কখনও কখনও বাস্তবতার সঙ্গে ফারাক তৈরি করে—এ নির্বাচনে তারও প্রতিফলন দেখা গেছে।

নিরঙ্কুশ বিজয় সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়, কিন্তু একই সঙ্গে দায় ও জবাবদিহি বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে। বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনআস্থা ধরে রাখা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দলটির কিছু তৃণমূল নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। সরকার গঠনের পর এসব অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় বিজয়ের ইতিবাচক বার্তা ম্লান হয়ে যেতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নও এখন অগ্রাধিকারের বিষয়। রাজনৈতিক পালাবদলের সময় শৃঙ্খলার শিথিলতা অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। প্রশাসনকে কার্যকর, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে না পারলে সরকারের ভাবমূর্তি দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলার অভিযোগও গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রকৃত অপরাধসংক্রান্ত মামলা বহাল রেখে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার করলে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠিত হবে। একই সঙ্গে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির সম্ভাব্য প্রতিবন্ধকতা, অস্থিতিশীলতা তৈরির প্রচেষ্টা কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রচারণা—এসব মোকাবিলায় সরকারকে কৌশলী ও সংযত থাকতে হবে।

দেশের মানুষ গত দেড় দশকে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, দুর্নীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ নিয়ে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে—এমন সমালোচনা রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ–এর বিরুদ্ধে—তার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। প্রশাসন ও দল—উভয় স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও দীর্ঘস্থায়ী জনসমর্থনে রূপ নেবে না।

নির্বাচনী জয় রাজনৈতিক সাফল্যের সূচক, কিন্তু প্রকৃত বিজয় হলো জনআস্থা অর্জন ও তা ধরে রাখা। বিএনপির সামনে এখন ইতিহাস রচনার সুযোগ—গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের বাস্তব উদাহরণ স্থাপন করার সুযোগ। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছে, সেই প্রত্যাশা পূরণে সরকার যদি আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতার পরিচয় দিতে পারে, তবে এই বিজয় সত্যিই অর্থবহ হবে। অন্যথায় ইতিহাস নির্মম—সে সুযোগ দেয়, কিন্তু বারবার নয়।

(লেখকঃ সংগঠক, টিইউসিকেন্দ্রীয় কমিটি)