চলমান সংবাদ

বিজন ভাবনা (৩১): ডরিয়েন গ্রে  

– বিজন সাহা

কখনই ভাবিনি যে এপস্টেইনকে নিয়ে লিখব। কেন? কে সে? বড় বিজ্ঞানী? অভিনেতা? লেখক? কবি? সাহিত্যিক? শিল্পী? সাংবাদিক? খেলোয়াড়? না – সে এর কোন কিছুই নয় সে, যদিও এক অর্থে সে অত্যন্ত বড় মাপের খেলোয়াড়। ডঃ ইউনুসের ভাষায় আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়। আর এ কারণেই সারা বিশ্ব আজ তাকে নিয়ে বলছে। একটা সময় নাকি ছিল যখন পশ্চিমা বিশ্বের এলিট মহলের সবাই তার সাহচর্য চাইত। তার সাথে পরিচয় না থাকা নাকি এক ধরণের ব্যর্থতা বলেই মনে করা হত পশ্চিমা এলিট সমাজে। এপস্টেইনের সাথে জড়িত এক নামকরা মহিলার পুরানো ইন্টারভিউ থেকে জানলাম যে এক সময় এপস্টেইনের তালিকাভুক্ত হওয়া মানে ছিল জাতে ওঠা। নিয়তির নির্মম পরিহাসে এই যে এখন তার তালিকায় নাম থাকা অনেকটা অভিশাপের মত। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে তার পক্ষে সম্ভব হয়েছিল বিশ্বের হর্তাকর্তাদের কোন না কোন ভাবে নিজের চারিদিকে জড়ো করা। সেটাই বা ক’জন পারে। আজ অনেকেই এপস্টেইনকে দায়ী করছে, তবে এটা মানতে হবে যে মার্কেট ইকনমির মূল কথা হচ্ছে ডিম্যান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই। তার সার্ভিসের ডিম্যান্ড ছিল বলেই সে সাপ্লাই চেইন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল আর যেহেতু সেই চেইন শুধু শক্তিশালী নয়, প্রায় সব দেশে আইন বহির্ভূত ছিল, তাই তার পেছনে যে শক্তিশালী লবি ছিল সেটাও ঠিক।

প্রশ্ন হচ্ছে এপস্টাইন নিয়ে কথা বলা কি আমার জন্য আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খোঁজ নেয়া নয় কি? হ্যাঁ এবং না – দুটোই। এটা অনেকটা তুমি যদি রাজনীতি নাও কর, রাজনীতি তোমাকে ছাড়বে না। আমরা যেহেতু এই বিশ্বেই বাস করি আর আমাদের প্রায় সবকিছুই আজকাল পশ্চিমা বিশ্বের একটা ছোট গ্রুপ দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাই চাই বা না চাই এপস্টাইন আমাদের পাশ কাটিয়ে যায় না। আর এ কারণেই এ ব্যাপারে নিজের কিছু ভাবনা শেয়ার করা।

এপস্টেইন ফাইল নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। এর কন্টেন্টের সত্যতা নিয়ে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না। যতদূর জানা যায় বিভিন্ন উৎস থেকে এসব ফাইল এসেছে মার্কিন সরকারের হাতে। এর সংখ্যা এত যে তারা নিজেরাও সব ফাইলের অথেনটিসিটি বা সত্যতা নিয়ে নিশ্চিত নয়। খবরে প্রকাশ মোট ফাইলের সংখ্যা ৬ মিলিয়নের মোট আর প্রকাশ করা হয়েছে ৩ মিলিয়ন। তাছাড়া বিগত কয়েক বছরে বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সত্য মিথ্যা হাজার রকম ফাইল তৈরি করা হয়েছে যার অন্যতম ছিল ট্রাম্পকে কমপ্রোমাইজ করার লক্ষ্যে তৈরি রাশান ফাইল। তাই এ কথাও মাথায় রাখতে হবে যে সেখানে আসল নকল সবই থাকতে পারে। খাদ ছাড়া যেমন সোনার গয়না হয়না তেমনি অতিরঞ্জন ছাড়াও এ ধরণের গল্প ঠিক জমে না। অন্যদিকে «যা রটে তার কিছুটা ঘটে» – এই প্রবাদ বাক্য যেমন মিথ্যা নয় তেমনি মিথ্যা নয় যে «বিনা আগুনে ধোঁয়া ওঠে না»।

তবে একটি কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে যারা পৃথিবীর ভাগ্য বিধাতা তাদের মধ্যে নৈতিকতার বালাই বলে কিছু আর অবশিষ্ট নেই। সামন্ত সমাজে রাজা বাদশাহ যা বলত সেটাই হত আইন। এখনও আমরা সেই অবস্থা থেকে খুব একটা দূরে যেতে পারিনি যদিও প্রক্রিয়া এখন অনেক বেশি গণতান্ত্রিক। আর এর ফলে আমরা আম জনতাও এ সমস্ত কেলেঙ্কারির দায় ভাগী। ডঃ ইউনুস বলেন, আলী রিয়াজ বলেন এরা সবাই এই খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে আসা মাল। মোটা দাগে অশ্লীল স্লোগান দেয়া জেন-জি আর এসব রত্নদের মধ্যে তেমন পার্থক্য নেই। জেন-জি, ওয়াজ করা হুজুর, বিএলএম এরা রুক্ষ কাঁচা মাল, ডঃ-রা আর এপস্টেইন ফাইলের নট নটীরা সংস্কৃতির মোড়কে উপস্থাপিত। একটা লিমিট অতিক্রম করার পর অর্থ অর্থহীন হয়ে পড়ে। তখন  মনে হয় সারা বিশ্ব তার পায়ের তলায়। এই ঘটনা আমাদের কিছুই শেখাবে না, আমরা আগের মতই এদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকব আর তাদের হাতে নিজেদের ভাগ্য সঁপে দেব।‌ আর এসব অপদার্থদের গলা ধাক্কা দিয়ে বের না করে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত এসব মানুষের কেচ্ছা কাহিনী শুনে আনন্দে হাততালি দেব।

পড়ুন:  বিজন ভাবনা: (৩০) বর্তমান নির্বাচন ও বাম রাজনীতি  -বিজন সাহা

বিল গেইটস এপস্টেইনের সাথে পরিচয়ের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ধরে নিলাম তিনি কোন অপকর্মের সাথে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু এটাও তো ঠিক এই মাপের লোকজন শুধু সময় কাটানোর জন্য কোথাও যান না। এদের কাছে সময় মানেই টাকা। তাই এসব গ্যাদারিং-এ যারা যায় তারা কিছু উদ্দেশ্য নিয়েই যায় – সেটা হতে পারে পলিটিক্যাল, কমার্শিয়াল বা অন্য কোন ধরণের। সবাই এখানে যায় নিজ নিজ কাজ নিয়ে, নিজের নিজের প্রয়োজনীয় মানুষের সাথে দেখা করতে, বিভিন্ন ধরণের চুক্তি করতে। সেই অর্থে সবাই এখানে লাভ খোঁজে। তাছাড়া এমনকি এই মাপের লোক যদি কোন উদ্দেশ্য নিয়ে নাও আসে, হোস্ট তার উপস্থিতি থেকে নিজে লাভ করে। সেটা শুধু গেট মানি নয়, এদের দেখিয়ে নতুন নতুন ক্লাইয়েন্ট সংগ্রহ করে। তাই লাভ দ্বিপাক্ষিক। এর মানে এমনকি যদি ধরেও নেই বিল গেটস সেখানে কিছুই করেননি তারপরেও তার উপস্থিতিই এপস্টেইনকে অনেক খারাপ কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। এটা অনেকটা নামকরা লোকদের ফ্রেন্ড লিস্টে রেখে নিজেকে অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্য করার মত। তারপরেও বিল গেটসের এই ক্ষমা চাওয়া সাহসী পদক্ষেপ।

কথা প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। কিছুদিন আগে একজনের সাথে কথা বলছিলাম। পরিচয় ফেসবুকেই। রাশিয়ায় এসেছে লেখাপড়া করতে বছর দুই আগে। কথা প্রসঙ্গে গানের কথা উঠল। আমাদের সময় হেমন্ত, মান্না, কিশোর – এরা ছিলেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। কথায় কথায় কবীর সুমনের নাম বলায় ও বলল

কবীর সুমন আপনার পরিচিত নাকি?
পরিচিত ঠিক বলব না, তাকে আমি চিনি, তিনি আমাকে চেনেন না। তাকে চিনি মানে তার গানের মাধ্যমে চিনি।
উনি কিন্তু আমার বন্ধু।
খুব ভালো তো। তুমি কি গান বাজনার সাথে জড়িত?
না। উনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। আমার লিস্টে আছেন।

কথাটা বললাম, এ জন্যেই যে আজকাল মানুষ এমনকি সেলেব্রেটিদের ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টে রেখেও ফায়দা লুটতে চায়। আর যখন বিল গেটসের মত লোকজন কারও সাথে ব্যক্তিগত ভাবে পরিচিত হন তখন তো সেটা অনেক ভাবেই ব্যবহার করা যায়। তাই এসব সম্পর্ক ততটা ইনোসেন্ট নয় বা অন্তত সব পক্ষ থেকেই ইনোসেন্ট নয়। এদের কিছু প্রচ্ছন্ন ক্ষমতা থাকে ঘটনাকে প্রভাবিত করার।

অনেক আগে অস্কার ওয়াইল্ডের ডোরিয়ান গ্রের পোর্ট্রেট নামক উপন্যাসটি পড়েছিলাম। বড় লেখকের লেখা মানেই সমাজের বাস্তব চিত্র, শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যত সমাজেরও। এমনি এমনি তো লেনিন তলস্তইকে রুশ বিপ্লবের আয়না বলেননি। যাহোক, ডোরিয়ান গ্রে ছিল এক অপূর্ব সুন্দর যুবক অভিজাত সমাজে যে ছিল কাঙ্ক্ষিত অতিথি। শিল্পী বেইসিল তার একটা পূর্ণদৈর্ঘ্য পোর্ট্রেট আঁকেন। সময় বয়ে যায়। গ্রের সমসাময়িক সবাই আজ কুৎসিত, বৃদ্ধ। কিন্তু গ্রে সেই আগের মতই সুন্দর যুবক। একদিন বেইসিল গেলেন তাঁর আঁকা গ্রের পোর্ট্রেট দেখতে। অবাক হয়ে দেখলেন আসল গ্রের যেখানে কোন পরিবর্তন হয়নি তার পোর্ট্রেট জীবিত মানুষের মত সময়ের সাথে বদলে গেছে। সেই পোর্ট্রেট আজ এক কুৎসিত বৃদ্ধের। হ্যাঁ, পশ্চিমা বিশ্বের সেই গণতন্ত্র, মানবতা, সাম্য এসব স্লোগান আগের মতই মানুষকে আকর্ষণ করে। হয়তো এসব স্লোগান শুনে আমরা এখনও ভল্টেয়ার ও অন্যান্য মনীষীদের কথা ভাবি। কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজ আজ বৃদ্ধ, অথর্ব। বাইরে সে গ্রের মত প্রাণবন্ত যুবক হলেও ভেতরে ভেতরে পচে গেছে। পচে গেছে এর এলিট। এপস্টেইন ফাইল আসলে পুঁজিবাদী বিশ্বের হর্তাকর্তাদের আসল চেহারা। এই যে আমরা গণতন্ত্র গণতন্ত্র করি, পশ্চিমা বিশ্বকে গণতন্ত্রের ধারক ও বাহক মনে করি, এদের শাসকরাই কিন্তু জনমত উপেক্ষা করে যা খুশি তাই করে যাচ্ছে, যুদ্ধ করছে, যাকে খুশি তাকে একনায়ক বলছে, যাকে ইচ্ছা তাকে শান্তি পুরস্কার দিচ্ছে। আর কি করলে এদের স্বৈরাচার বলা যাবে? হয়তো এপস্টেইন ফাইল আমাদের চোখ খুলে দেবে, আমরা শেষ পর্যন্ত কোদালকে কোদাল বলা শিখব।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো