চলমান সংবাদ

দেশে চার কোটি দরিদ্র, আর মন্ত্রীদের জন্য ৭৮৬ কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট!

ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানদের জন্য তিনটি বহুতল বিলাসবহুল আবাসিক ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রায় ৭৮৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই প্রকল্পে ৭২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার প্রতিটির আয়তন ৮ হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট—যা সাধারণ মানুষের বাসস্থানের সঙ্গে সম্পূর্ণ বেমানান।

যে দেশে চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে, যেখানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট ও রাজস্ব ঘাটতিতে সাধারণ মানুষ নাভিশ্বাস ফেলছে—সেই দেশে শাসকগোষ্ঠীর জন্য এমন বিলাসী আবাসন প্রকল্প শুধু অমানবিকই নয়, এটি চরম জনবিরোধী সিদ্ধান্ত।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় মন্ত্রীদের বসবাসের জন্য ইতিমধ্যেই ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাট রয়েছে, যার একটি বড় অংশ খালি। বিচারপতি ও সাংবিধানিক পদের ব্যক্তিদের জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থাও বিদ্যমান। তারপরও নতুন করে বিশাল আকৃতির ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে মূলত আমলাতান্ত্রিক স্বার্থ রক্ষার জন্য—এমন অভিযোগ উঠেছে। মন্ত্রীদের নতুন ভবনে সরিয়ে বর্তমান বড় ফ্ল্যাটগুলো দখলে নেওয়ার আগ্রহ থেকেই এই প্রকল্পের চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এই প্রকল্পে প্রতিটি ভবনে সুইমিংপুল, জিমনেশিয়াম, কমিউনিটি স্পেস রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু সুইমিংপুলের জন্যই প্রস্তাবিত বরাদ্দ ৩ কোটি টাকা, আসবাব ও পর্দা কেনায় ২০ কোটি টাকা। যখন দেশের মানুষ নিত্যপণ্যের দাম সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রীয় অর্থে এমন বিলাসিতার আয়োজন জনগণের সঙ্গে নির্মম তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক যথার্থই বলেছেন, ঔপনিবেশিক আমলে শাসকদের জন্য যেমন বিশাল বাংলো নির্মাণ করা হতো, আজও সেই মানসিকতা বহাল রয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের ভাষায়, রাজস্ব আদায়ে সরকার মারাত্মকভাবে পিছিয়ে আছে—এমন অবস্থায় ঘাড়ে আর কত বোঝা নেওয়া যায়, ঘাড় তো আগেই ভেঙে পড়েছে।

আরও উদ্বেগজনক হলো—একই ভবন বা কমপ্লেক্সে নির্বাহী বিভাগের সদস্যদের সঙ্গে বিচার বিভাগ ও সাংবিধানিক সংস্থার ব্যক্তিদের বসবাসের পরিকল্পনা। এতে রাষ্ট্রের ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হয়, যা সুশাসনের পরিপন্থী।

আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—এই বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। বিদ্যমান সরকারি আবাসনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, জনদুর্ভোগ ও নৈতিক দায় বিবেচনায় রেখে রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের অগ্রাধিকার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। জনগণের টাকায় বিলাস নয়—জনকল্যাণই হোক রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।