কোম্পানির মুনাফায় শ্রমিকের ৫ শতাংশ: আইন আছে, অধিকার সীমিত, বাস্তবায়ন দুর্বল– ফজলুল কবির মিন্টু

বাংলাদেশের শ্রম আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী প্রতিটি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন বাধ্যতামূলক। যেসব প্রতিষ্ঠানের পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ১ কোটি টাকা অথবা স্থায়ী সম্পদের মূল্য কমপক্ষে ২ কোটি টাকা, সেসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই বিধান কার্যকর হওয়ার কথা। প্রয়োজনে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও এই আইনের আওতায় আনতে পারে।
আইন অনুযায়ী, যোগ্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দুটি তহবিল গঠন করতে হবে—একটি শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল এবং একটি শ্রমিক কল্যাণ তহবিল। প্রতি বছর নিট মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ করার বিধান রয়েছে। এই ৫ শতাংশ অর্থ ৮০:১০:১০ অনুপাতে বণ্টিত হওয়ার কথা। অর্থাৎ, কোনো প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা ১০০ টাকা হলে ৪ টাকা সরাসরি শ্রমিকদের মধ্যে বণ্টিত হবে, ৫০ পয়সা জমা হবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে এবং বাকি ৫০ পয়সা যাবে রাষ্ট্রীয় শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে। এটি শ্রমিকদের অতিরিক্ত প্রাপ্য এবং কোনো বিদ্যমান সুযোগ–সুবিধার বিকল্প নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—আইন কাগজে-কলমে থাকলেও এর প্রয়োগ অত্যন্ত সীমিত। হাতে গোনা কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কিছু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া অধিকাংশ শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল, শ্রমিক কল্যাণ তহবিল কিংবা রাষ্ট্রীয় শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নিয়মিত অর্থ জমা দেয় না। ফলে শ্রমিকেরা কোম্পানির মুনাফায় তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং রাষ্ট্রীয় তহবিলেও যে বিপুল অর্থ জমা হওয়ার কথা, সেটিও বাস্তবে হচ্ছে না।
যেসব প্রতিষ্ঠানে তহবিল গঠন করা হয়েছে, সেখানেও অনেক ক্ষেত্রে আইনের নির্দেশনা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। আইনে বলা হয়েছে, শ্রমিক অংশগ্রহণ ও কল্যাণ তহবিল পরিচালনার জন্য সমান প্রতিনিধিত্বে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করতে হবে, যেখানে শ্রমিক প্রতিনিধি ও ব্যবস্থাপনা পক্ষ উভয়ের সদস্য থাকবে। কিন্তু বাস্তবে বহু প্রতিষ্ঠানে এই বোর্ড গঠিতই হয়নি। এসব বিষয় নিয়মিত তদারকির জন্য কোনো কার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০০৬-এর আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কল্যাণে এই ফাউন্ডেশন গঠিত হয়। কিন্তু প্রায় দুই দশক পার হলেও ফাউন্ডেশন প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার যোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৫২৫টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে তহবিলে অর্থ জমা দিয়েছে। ওই সময় পর্যন্ত তহবিলের মোট স্থিতি ছিল ১ হাজার ২৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। শুধু জুন মাসেই জমা পড়েছে ২৯ কোটি টাকা, অথচ ওই মাসে শ্রমিকদের মাঝে কোনো অনুদান বিতরণ হয়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশে সাড়ে ৭ কোটির বেশি মানুষ কর্মে নিয়োজিত, যার মধ্যে ৮৫ শতাংশেরও বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। অথচ ২০০৬ সাল থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত ফাউন্ডেশন মাত্র ৩০ হাজার ২৮৫ জন শ্রমিককে মোট ১৪১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছে, যা দেশের মোট শ্রমশক্তির মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য চার শতাংশ।
ফাউন্ডেশন থেকে সহায়তা পাওয়ার আবেদন প্রক্রিয়াও অত্যন্ত জটিল। আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা, শ্রম সংগঠন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সুপারিশ প্রয়োজন হয়। আর অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের অনুমোদন নিতে হয় স্থানীয় প্রশাসন ও পরিদর্শন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তহবিল মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের জন্য হলেও তাদের আবেদন প্রক্রিয়াই সবচেয়ে জটিল এবং সহায়তার পরিমাণও তুলনামূলক কম। ফলে অনেক শ্রমিক সামান্য সহায়তার জন্য এত ঝামেলায় যেতে অনিচ্ছুক হন।
অসুস্থ, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বা দারিদ্র্যপীড়িত শ্রমিকেরা আবেদন করেও মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন। অনেক ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কোনো সহায়তাই পান না। ফলে এই তহবিল শ্রমিকদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অনেক সময় হয়রানির উৎসে পরিণত হয়েছে।
কাঠামোগত দিক থেকেও শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন দুর্বল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১ জন মহাপরিচালক দায়িত্ব পালন করেছেন, যাদের কেউই পূর্ণকালীন ছিলেন না। দীর্ঘদিন ফাউন্ডেশনের কোনো স্থায়ী অফিস ছিল না। বর্তমানে অনুমোদিত জনবল মাত্র ১৮ জন, কর্মরত আছেন ১২ জন। সারাদেশে নেই কোনো আঞ্চলিক কার্যালয়, এমনকি নিজস্ব যানবাহনও নেই।
আইন অনুযায়ী, যেসব কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন কমপক্ষে ১ কোটি টাকা বা মোট সম্পদ ২ কোটি টাকা, তাদের লভ্যাংশের ০.৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের তহবিলে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এটি মূলত শ্রমিকদেরই অর্থ, কারণ কোম্পানির লভ্যাংশের ৫ শতাংশ শ্রমিকদের জন্য সংরক্ষিত থাকার কথা। দেশে ৮ হাজারের বেশি কোম্পানি এই তহবিলে অর্থ দেওয়ার যোগ্য হলেও বাস্তবে ১০ শতাংশেরও কম প্রতিষ্ঠান এই দায়িত্ব পালন করছে।
যেসব প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে অর্থ জমা দিয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে গ্রামীণফোন, রবি, ইউনিলিভার বাংলাদেশ, ম্যারিকো, লাফার্জহোলসিম, লিন্ডে বাংলাদেশ, মেঘনা ও যমুনা অয়েল, এসিআই, বেক্সিমকো ও নুভিস্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, ট্রান্সকম গ্রুপসহ কয়েকটি বড় দেশীয় ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। এ পর্যন্ত ফাউন্ডেশন ৯৭৪ জন মৃত শ্রমিকের পরিবারকে ৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা, ২৭ হাজার ৪৭৯ জন শ্রমিককে চিকিৎসা সহায়তায় ১২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা এবং ১ হাজার ৮৩২ জন শিক্ষার্থীকে ৭০ লাখ ৯৪ হাজার টাকা শিক্ষা সহায়তা দিয়েছে।
শ্রমিক অংশগ্রহণ তহবিল ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের মূল দর্শন হলো—শ্রমিক যেন প্রতিষ্ঠানের লাভে অংশীদার হয় এবং দুঃসময়ে ন্যূনতম সামাজিক সুরক্ষা পায়। কিন্তু আইনের এই মানবিক ও ন্যায্য দর্শন বাস্তবে কার্যকর না হওয়ায় শ্রমিকেরা আজও বঞ্চিত।
এখন সময় এসেছে আইন বইয়ে রেখে সন্তুষ্ট না হয়ে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করার। শ্রম মন্ত্রণালয়, পরিদর্শন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর নিয়মিত তদারকি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগই কেবল তহবিলগুলোর সুফল শ্রমিকেরা পেতে পারে। অন্যথায় “শ্রমিক কল্যাণ” শব্দটি কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
(লেখক: কো–অর্ডিনেটর, বিলস চট্টগ্রাম সেন্টার ও সংগঠক, টিইউসি কেন্দ্রীয় কমিটি)
