বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা (২২): রাশিয়া টাকা আর ইউরোপের লোলুপ দৃষ্টি   

-বিজন সাহা

ছোটবেলায় আমরা গনি মিয়াঁর গল্প পড়েছিলাম। গনি মিয়াঁ গরীব কৃষক। তার নিজের জমি নাই, সে অন্যের জমি চাষ করে। ছেলের বিয়েতে সে অনেক ধূমধাম করল। এখন তার দুঃখের সীমা নাই।  আমার অবস্থা অবশ্য গনি মিয়াঁর চেয়ে খুব একটা ভালো নয়, তবে চেষ্টা করি ধূমধাম না করার জন্য। তাই দুঃখ থাকলেও সেটা অসীম নয়। তবে কথা আমাকে নিয়ে নয়, কথা ইউরোপকে নিয়ে। বলে রাখি যে শুধু গরীব গনি মিয়াঁই নয়, বেপারোয়া ভাবে খরচ করলে ধনীরাও দুঃখের সাগরে ডুবে যায়। যাহোক, রাশিয়ায় সাথে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতে গিয়ে ইউরোপের অর্থনীতির এখন বেহালা বাজানোর অবস্থা। কথায় আছে সুখে থাকলে ভূতে কিলায়। সত্তর দশক থেকে আর বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউরোপের অর্থনীতির ষ্টীম ইঞ্জিনের জ্বালানি যোগাত রাশিয়া। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা গল্পের নট নটী সেজে বেকে বসল। কোন সে গল্প? একদিন হাত বলল, “আমি সারাদিন কাজ করি আর পেট শুধু বসে বসে খায়। এই অন্যায় আর মেনে নেয়া যায় না।” পা সায় দিয়ে বলল, “আমিও দূর দূরান্তে হেঁটে বেড়াই, আর ও শুধু খায়। সেটা কি কোন কথা হল?” এরপর চোখ, কান, নাক, মুখ সবাই একে একে তাদের কর্মময় জীবনের গল্প শোনাল আর শেষে সবাই মিলে পেটের বিরুদ্ধে অনাস্থা ঘোষণা করল। ঠিক হল সবাই ধর্মঘটে যাবে। পা বসে রইল সারাদিন, হাত কাজকর্ম বাদ দিল, চোখ আঁখি মেলল না, কান শুনতে অস্বীকার করল, মুখ মুখে খাবার তুলল না যদিও পেটের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে ভুলল না, নাক দম বন্ধ করে বসে রইল। একসময় ক্ষুধার্ত পেট ধৈর্য হারা হয়ে সবাইকে মাথা ঠাণ্ডা করে তার কথা শুনতে বলল, তাকে খাবার দিতে বলল। কিন্তু তখন পা আর হাঁটতে পারছে না, হাত আর কিছু করতে পারছে না। পেটকে শাস্তি দিতে গিয়ে এখন সবার মুমূর্ষু অবস্থা।  অর্থনীতি হচ্ছে সেই পেট যা খালি থাকলে আর সব নীতি তা রাজনীতি হোক, শিক্ষানীতি হোক, চিকিৎসা ব্যবস্থা হোক সব ধ্বসে পড়ে। আর এ কারণেই রাজনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও অর্থনীতিবিদরা রুশ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার বিপক্ষে। কিন্তু একবার গোঁ যখন একবার ধরেছে তখন লজ্জার মাথা খেয়ে রাশিয়ার সাথে যে সন্ধি করবে তাতেও মর্যাদায় বাঁধে। মহা মুস্কিল।

সমস্যা হল যুদ্ধ তো এমনি এমনি চলে না। সেনাদের খাদ্য লাগে, অস্ত্র লাগে। যুদ্ধের পেটে ক্ষুধার জ্বালা সর্বগ্রাসী। আগের যুগ নেই যে রাজার আদেশে প্রজারা যুদ্ধ করতে যাবে। তাছাড়া এখন যুদ্ধ এক ভীষণ লাভজনক ব্যবসা। আর যাই লাভজনক তার পেছনে বিনিয়োগ করতে হয় প্রচুর। তাই যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য ইউক্রেনকে তো টাকা দিতে হবে। টাকা কোথায়? রাশিয়ার তেল কেনা না গেলেও তার টাকা নিতে তো সমস্যা নেই। এটা অনেকটা স্বামী স্ত্রীর ঝগড়ার পরে বিশেষ করে স্ত্রীরা বিভিন্ন অজুহাতে স্বামীর কাছ থেকে অন্য কোন কিছু নিতে রাজী না হলেও টাকা নিতে মোটেই আপত্তি করে না। তাই এখন তারা বিভিন্ন উপায় খুঁজছে রাশিয়ার প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ইউরো মেরে দেবার জন্য। কিন্তু সেটা কি এতই সোজা? দুই যুগের বেশি আগে ন্যাটো যখন যুগোস্লাভিয়া আক্রমণ করে এবং কসোবাকে স্বীকৃতি দেয়, তখন রাশিয়া বলেছিল তোমরা একটা  দৃষ্টান্ত তৈরি করলে। পশ্চিমা বিশ্বে অনেক কিছুই হয় পূর্বের কোন ঘটনাকে রেফারেন্স বা উদাহরণ হিসেবে ধরে। আসলে কোন ঘটনাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করা নতুন কিছু নয়। বেদ বা কোরআনে কোন কিছুর সরাসরি ব্যাখ্যা না থাকলে পুরাণ বা হাদিসের দোহাই দিয়ে সেসব ব্যাখ্যা করা হয়। আর এভাবেই কসোবার ঘটনা রাশিয়ার সামনে ক্রিমিয়া দখলের দুয়ার খুলে দিয়েছিল। তখন পশ্চিমা বিশ্ব কসোবাকে স্বীকৃতি না দিলে ক্রিমিয়ার ঘটনা ঘটত কিনা সে প্রশ্ন থেকেই যাবে। তাই এখন ইউরোপ যদি তাদের ওখানে জমা রাখা রাশিয়ার টাকা মেরে দেয় সেটা রাশিয়ার সামনে এদেশে থাকা ওদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার সুযোগ তৈরি করে দেবে। যতদূর জানা যায় শুধু জার্মানির এখানে আছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউরো। এছাড়া প্রাইভেট কোম্পানির অর্থ তো আছেই।

মনে রাখতে হবে যে সমাজে অর্থনীতি রাজনীতির চেয়েও বেশি মৌলিক ভূমিকা পালন করে। কেননা অর্থনীতির সাথে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ও বয়স নির্বিশেষ সমাজের প্রতিটি সদস্য সরাসরি জড়িত, রাজনীতির সাথে অধিকাংশ মানুষ জড়িত প্রচ্ছন্ন ভাবে। তাই তো সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র এসব বিভাজনের মূলে আছে অর্থনীতি বা সম্পদের বন্টন ব্যবস্থা। অর্থনীতির চালিকা শক্তি হচ্ছে কথা বা বিশ্বাস। বিশ্বাস করেই একজন আরেক জনকে ধার দেয়, বিশ্বাস করেই মানুষ ব্যাংকে টাকা জমা রাখে। এই বিশ্বাস একদিনে অর্জিত হয়নি। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই পশ্চিমা বিশ্বের অর্থব্যবস্থার উপর অন্যান্য দেশের এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। ফলে বিভিন্ন দেশ পশ্চিমা দেশের ব্যাংকে তাদের জাতীয় সম্পদ জমা রাখে, সরকারি বন্ড কিনে সেসব দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করে। রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বাজারে স্বাভাবিক ভাবে অর্থনৈতিক কাজকর্ম চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করায় রাশিয়া সহ অনেক দেশ ডলারের উপর তাদের নির্ভরতা কমিয়ে এনেছে, আনছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বানিজ্য হচ্ছে এসব দেশের মুদ্রায়। এখন ইউরোপ রাশিয়ার টাকা চুরি করলে অন্যান্য দেশ যে ইউরোপ থেকে তাদের সম্পদ প্রত্যাহার করতে চাইবে তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। যার ফলে অর্থনীতিবিদরা এ ধরণের এক্সপেরিমেন্ট করতে আগ্রহী নয়। যদি রাজনীতি শক্তি দিয়ে করা যায়, অর্থনীতির চাকা চালু রাখতে পারে মানুষের বিশ্বাস। এজন্যেই অর্থনীতির স্বাভাবিক গতির জন্য দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। জমা রাখা সম্পদ ফেরত পাবে এই বিশ্বাস আছে বলেই মানুষ রাষ্ট্রের বন্ড কেনে, রাষ্ট্রীয় খাতে বিনিয়োগ করে। এক্ষেত্রে জবরদস্তি মানে ডাকাতি। তাই এমনকি এখন যদি বিভিন্ন দেশ ইউরোপ থেকে তাদের বিনিয়োগ সরিয়ে না ও নেয়, ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাজারে সেটা প্রভাব ফেলতে পারে। আর একবার এ ধরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করলে পরবর্তীতে কোন দেশের কোন বিনিয়োগই আর সুরক্ষিত থাকে না। এটাকে দৃষ্টান্ত হিসেবে ব্যবহার করে যেকোনো দেশ যেকোনো দেশের টাকা আটকে রাখতে পারে। সেক্ষেত্রে সৃষ্টি হবে অরাজকতা। সেটা বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক ধ্বস নামাতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইউরোপ এখন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মন্দা তাদের জেঁকে বসেছে। তাই অন্যান্য দেশ ইউরোপে বিনিয়োগ বন্ধ করলে সেটা হবে মরার উপর খাঁড়ার ঘা। শুধু তাই নয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ইউরোর ভবিষ্যৎ তখন অন্ধকারাচ্ছন্ন হবে। ডলারের বাজার এখন মন্দার দিকে। ইউরো ডলারের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল বলেই আমেরিকা সব সময় চেষ্টা করেছে ইউরোকে দাবিয়ে রাখতে। হয়তো এটাও কারণ যে আমেরিকা বারবার ইউরোপকে রুশ সম্পদ দখল করার জন্য উৎসাহিত করছে। যদি সব কিছুর পরে ইউরোপকে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে হটিয়ে দেয়া যায় তাহলে ডলার শুধু তার পূর্বাবস্থা ফিরে পাবে না, ইউরোপের দক্ষ বিশেষজ্ঞ ও শিল্প আমেরিকায় পাড়ি জমাবে। অনেক দিন থেকেই আমেরিকা ইউরোপ থেকে চলে যেতে চাইছে। কারণ এখানে নেবার মত খুব বেশি কিছু বাকি নেই দক্ষ বিশেষজ্ঞ ছাড়া। যদি সব ঠিকঠাক কাজ করে তবে তৃতীয় বিশ্ব নয়, ইউরোপ হবে আমেরিকায় বুদ্ধি আমদানির প্রাইম মার্কেট। কিন্তু এই সহজ সত্য বোঝার ক্ষমতা ইউরোপের নেতারা হারিয়ে ফেলেছে বলেই মনে হয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল ইউরোপ রাশিয়ার টাকা ইউক্রেনকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দিতে চাইছে। যুদ্ধে সাধারণত পরাজিত পক্ষ বিজয়ীকে ক্ষতিপূরণ দান করে। সেক্ষেত্রে ইউরোপের কর্মকাণ্ড নতুন এক দৃষ্টান্তের জন্ম দিতে পারে যা বিশ্ব পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করবে। এমনকি যদি রাশিয়া কোন সামরিক বল প্রয়োগ না করে বা রাশিয়ায় জমে থাকা পশ্চিমা সম্পদ বাজেয়াপ্ত না করে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোর্টে কেস করে সেটাও কম কিছু হবে না। যদিও ইউরোপের নেতারা বলছে কোন কোর্ট রাশিয়ার পক্ষে রায় দেবে না, তবে সবাই বোঝে সেটা হলে হবে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেই। একটা অন্যায় আরেকটা অন্যায়ের জন্ম দেবে। সেক্ষেত্রে প্রায় ভেঙ্গে পড়া সমস্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্কই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে।

পড়ুন:  বিজন ভাবনা(২১): যুদ্ধ আর শান্তির গোল্লাছুট -বিজন সাহা  

একটা সময় ছিল যখন আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ ইউরোপ আমেরিকার নেতৃত্বের দিকে তাকিয়ে থাকত তাদের সততার জন্য। এখনও অনেকেই ইউরোপের কোন মন্ত্রীকে সাইকেল চালিয়ে অফিসে যেতে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়, তবে এদের অধিকাংশই এখন আর ব্যক্তি জীবনে সৎ নন। বিশেষ করে ইউরপিয়ান ইউনিয়নের আমলারা। এদের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থ কেলেঙ্কারির খবর নতুন কিছু নয়। রাজনীতি বলি, ধর্ম বলি সব জায়গায় যখন অর্থের ছড়াছড়ি তখন এদের কাছ থেকে অন্য কিছু আশা করা কঠিন। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আমলাদের কাছ থেকে। দেশ না থাকলে দেশপ্রেম থাকে না। এরা দেশের ঊর্ধ্বে। এখানে প্রাঙ্করা প্রায়ই ইউরোপ আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে খোলামেলা আলোচনা করে ছদ্ম নামে। সেদিন বাইডেনের নিরাপত্তা বিষয়ক দুজন উপদেষ্টার সাথে তাদের আলোচনার রেকর্ড ফাঁস করা হল। ওরা ভাবছিল ইউক্রেনের কোন নেতার সাথে কথা বলছেন। তাদের কথা থেকে স্পষ্ট হল যে তারা ভাবতে পারেনি যে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত ইউক্রেন আক্রমণ করে বসবে। তবে তাদের কাজের জন্য তারা মোটেও দুঃখিত নয়। কারণ এটা তাদের বিজনেস। যুদ্ধ লাগল, যদি রাশিয়াকে পরাজিত করা যায় ভালো, না গেলে অস্ত্র ব্যবসা চলছে, তারা অর্থ উপার্জন করেছে, করছে। কিন্তু এসবের মধ্য দিয়ে হাজার হাজার মানুষ যে মারা যাচ্ছে এ নিয়ে তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। একই কথা বলা যায় সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে যারা সেই সময় ইউক্রেনকে ঘিরে হাইপ তুলেছে। যুদ্ধের খবর হট কেকের মত বিক্রি করেছে। আসলে সমাজে যখন প্রতিটি মানুষ, অন্তত যাদের কাজকর্ম জনজীবনে প্রভাব ফেলে,  জবাবদিহিতার আওতায় না থাকে এরকম ইউক্রেন ঘটতেই থাকবে। এবং সেটা শুধু ইউক্রেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো