বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা (২০): নিউ ইয়র্ক নির্বাচন  

-বিজন সাহা

মামদানি নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও নির্বাচনের আগে অনেকেই তাঁর ধর্মীয় পরিচয় সামনে আনার চেষ্টা করছে তবে আমার ধারণা তিনি জিতেছেন তার রাজনীতির কারণে যা সাধারণ মানুষের স্বার্থে লড়াই করার কথা বলে। এটা ঠিক একদল লোক তাঁর মুসলিম পরিচয় ব্যবহার করবে নিজেরা ব্যক্তিগত ভাবে লাভবান হবার জন্য আবার আরেক দল লোক মুসলিম পরিচয় সামনে এনে তাঁর বিরোধিতা করবে। হয়তো দুই দলের কাছেই এর পেছনে যুক্তি আছে। তবে দ্বিতীয় দলের উচিত হবে তাঁকে মুসলিম হিসেবে না দেখে একজন ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করা। কেননা একমাত্র এভাবেই তারা তাঁকে মৌলবাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে। আমি অস্বীকার করব না যে শুধু মুসলিম পরিচয়ের জন্যেই তিনি অনেকের ভোট পেয়েছেন (এবং অনেকের ভোট পাননি)। এখন তিনি নির্বাচিত মেয়র – দলমত নির্বিশেষে সবার। এতদিন তাঁর দায়িত্ব ছিল আপনাদের ভোট পাবার, এ জন্যে তিনি অন্যান্য পরিচয়ের সাথে মুসলিম পরিচয় ব্যবহার করলে করতেও পারেন। তাছাড়া কেউ যদি নিজের জন্ম পরিচয় ব্যবহার করে তাতে ক্ষতি কী? চাক বা না চাক আমেরিকার নাগরিকরা যুগ যুগ ধরে শ্বেত আমেরিকান, আফ্রো আমেরিকান, ল্যাটিন, ইন্ডিয়ান আমেরিকান এসব নামেই পরিচিত হবে তা সে শত শত বছর এদেশে বাস করলেও। এখন আপনাদের দায়িত্ব তাঁকে নিজের করে নেবার যাতে তিনি সত্যিকার অর্থেই দলমত ধর্ম নির্বিশেষে সবার হতে পারেন। বারাক ওবামা যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তখন এরকম উচ্ছ্বাস দেখা গেছিল। এমনকি তাঁকে অগ্রিম নোবেল শান্তি পুরস্কার পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল। তিনি শেষ পর্যন্ত ডিপ স্টেট বলেন আর এস্টাবলিশমেন্ট বলেন তাদের একজনে পরিণত হন। মামদানি কোন পথে যাবেন সেটা অনেকাংশে নির্ভর করবে আপনাদের উপর। হ্যাঁ, অন্ধ সমর্থন বা ঘৃণা নয়, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া দরকার যদি তিনি সত্যি সত্যিই সাধারণ মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করেন।

উপরের এই কথাগুলো প্রায় অপরিবর্তনীয় ভাবে লিখেছিলাম ০৫ নভেম্বর। ইতিমধ্যে মামদানি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য জেনেছি বিভিন্ন সূত্রে। সেটা কতটুকু সত্য বা মিথ্যা সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ নই। তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর একটা চিত্র তৈরি হয়েছে। এসব নিয়ে অনেক আগেই বলব বলে ভেবেছিলাম, তবে অন্যান্য ইস্যু নিয়ে লিখতে গিয়ে এই ইস্যু চাপা পড়ে গেছে। ফেসবুক থেকেই জানলাম, মামদনির অন্যতম প্রধান স্পন্সর জর্জ সোরস। হাঙ্গেরিয়ান বংশোদ্ভূত এই টাইকুনের নাম দেশে দেশে রঙিন বিপ্লবের সাথে জড়িত। আমার মনে আছে ২০২০ সালের কথা। গণ মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীরা এসেছিলেন। আমরা একদিন ডিপার্টমেন্টে বসে গল্প করছিলাম। সেখানে ছিলেন আর্জেন্টিনার এক প্রাক্তন ছাত্রী। তখন ষাটোর্ধ। কথায় কথায় বললেন
– জান, আমেরিকায় কেন কোনদিন বিপ্লব হবে না?
– না তো। কেন?
– ওখানে আমেরিকান দূতাবাস নেই।
এখন আমার মনে হয় জর্জ সোরস যেখানে আছেন সেখানে দূতাবাস দরকার পড়বে না।

নব্বইয়ের দশকে রাশিয়ায় সোরস কাজ করেছেন, মানে তাঁর ফান্ড। অস্বীকার করব না যে সে সময় তিনি অনেককেই দারিদ্র্যের হাত থেকে রক্ষা করেছেন। একটা দেশ যখন নাই হয়ে গেল, ভেঙ্গে পড়ল সমস্ত অবকাঠামো, শিক্ষকগণ বাঁচার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করতে শুরু করলেন এ সময় সোরস ফান্ড অনেকের জন্য ডুবন্ত মানুষের কাছে খড়কুটার মত ছিল। সেই সময় টের পাওয়া না গেলেও ধীরে ধীরে তাঁর উদ্দেশ্য পরিস্কার হতে থাকে। সেই সাহায্য ছিল আসলে ভেতর থেকে রুশ বিরোধী এক পঞ্চম বাহিনী গড়ে তোলা। রাশিয়ায় যে রুশ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আছে (রুশ বিরোধী, কারণ তারা সত্যিকার অর্থেই রাশিয়াকে টুকরো টুকরো করে অনেকগুলো করদ রাজ্যে পরিণত করার পশ্চিমা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলে আর কর্মকাণ্ড চালায় ইউরোপ থেকে) সেটা গড়ে তোলার পেছনে সোরস ফান্ড কাজ করেছে। তিনি জাতীয় স্বার্থে রাজনীতির কথা ভাবেন না, সমস্ত বিশ্বকে পদানত করাই তাঁর লক্ষ্য। তিনি গ্লোবালাইজেশনের অন্যতম প্রবক্তা তবে সেটা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল নয় – এটা নতুন উপনিবেশবাদ, যেখানে কর্তৃত্ব করবেন বিশ্বে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিরা, তাঁরাই হবেন পৃথিবীর রাজা–উজির। আসলে তাঁরা কাজ করবেন নেপথ্য থেকে, হবেন আসল কিং মেকার। তাই মামদানির পেছনে সোরসের সমর্থন দেখে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ না হয়ে যায় না। আচ্ছা সোরস কি সোর্সের মানে উৎসের বিকৃত রূপ? সব ধরণের দুরজোগের উৎস?  যদিও মামদানি বার্নি স্যান্ডারসের লোক বলেই পরিচিত এবং সোরসের সমর্থন হতে পারে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। তবে কিছুদিন আগে আমরাও হাসিনাকে ঠেকাতে সবার সাহায্য নিয়েছি আর পরিণামে দেশটাকে জামাত শিবিরের হাতে তুলে দিয়েছি।

পড়ুন:  বিজন ভাবনা (১৯): ভাষা - শিক্ষা – সংস্কৃতি -বিজন সাহা

ফেসবুকে মামদানির পাশে অনেকের ছবি দেখলাম। জনপ্রিয় লোকদের সাথে ছবি তুলে নিজেও জনপ্রিয় হবার চেষ্টা নতুন নয়। হতে পারে এরা সেই লক্ষ্যেই মামদানির চারপাশে ভিড় জমিয়েছিল। এদের অনেকেই শুনলাম বাংলাদেশে জামায়েতে ইসলামির বিভিন্ন সময়ের উচ্চপর্যায়ের নেতা এবং কুখ্যাত আলবদর নেতাদের উত্তরসূরি। এটা স্বাভাবিক ভাবেই বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দেয়। কারণ রতনে রতনে চেনে। এছাড়া মামদানির অনেক কথাই পপুলিস্ট বলে মনে হল। যেমন বিনা ভাড়ায় পাবলিক ট্র্যান্সপোর্ট। অবশ্যই সামজে বিভিন্ন ক্যাটাগরির মানুষ এসব সুবিধা পায়, তবে গণ হারে সেটা করা চাট্টিখানি কথা নয়। এটা করতে না পারলে পাবলিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এছাড়া সেটা যদি ইউ ইয়র্কের ধনীদের উপর অতিরিক্ত ট্যাক্স বসিয়ে করা হয় সেটাও ক্ষতিকর হতে পারে। কারণ চাপ পড়বে মূলত সেখানকার সাদাদের উপর। দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন মেন্ডেলা ছিলেন, তবে মামদানি যে রবার্ট মুগাবে হবেন সেটা কে জানে? তাহলে সেখানে জিম্বাবুয়ের মত পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। নিউ ইয়র্কের সাদারা অন্য শহরে চলে যেতে পারে। আমার এক বন্ধু যে এখন কানাডায় থাকে একবার বলেছিল কোন এলাকায় এশিয়ানরা এসে বসবাস করতে শুরু করলে স্থানীয় সাদারা ধীরে ধীরে সেই এলাকা ছেড়ে চলে যায়। তাই মামদানির উচিৎ হবে সমস্ত নিউ ইয়র্কবাসীর মেয়র হওয়া, শুধু নিজের ভোটার মানে ইমিগ্র্যান্ট, তরুণ, আফ্রো আমেরিকান ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের মেয়র হতে গেলে সংঘাত অনিবার্য। জর্জ সোরস সেটাই চান কিনা কে জানে? আমেরিকা আজ দুই ভাগে বিভক্ত। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা আমাদের দেশের আওয়ামী লীগ আর বিএনপির মতই একে অন্যকে ন্যুন্যতম স্পেস দিতে রাজী নয়। অনেক ক্ষেত্রে এই দুই দলের বিরোধিতা উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকের হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব বলে মনে হয়। এটা ঠিক সেটা এখনও যুদ্ধের রূপ লাভ করেনি তবে বিনাযুদ্ধে নাহি দেব সুচাগ্র মেদিনী হুঙ্কার প্রায়ই শোনা যায়।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় শক্তির কথা শুনে আসছি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে এক বিকল্প শক্তি। কথা ছিল সেই তৃতীয় স্থান দখল করবে বাম গণতান্ত্রিক শক্তি। কিন্তু বাস্তবে সেই শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চরম দক্ষিণপন্থী শক্তি। রাশিয়ায় একটি জোঁক আছে। দুই লোক যখন ড্রিঙ্ক করতে বসে তখন থার্ড ম্যান খোঁজে। কেউ এলে জিজ্ঞেস করে “থার্ড ম্যান হবে?” সবাইকে জিজ্ঞেস করে না আবার সবাই হতেও পারে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় বামদের আর কেউ তৃতীয় শক্তি হতে ডাকে না, তাই দক্ষিণপন্থীরাই চলে আসে। এবং অনেক ক্ষেত্রে আসে বামদের কাঁধে চেপে। সেটা ইরানে হয়েছে, বাংলাদেশে হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতই ডেমোক্র্যাটিক ও রিপাবলিক পার্টির দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি কারণে আমেরিকার তরুণ সমাজ পরিবর্তন চাইছে। ২০০৮ সালে তরুণ সমাজ যেমন ব্যাপক ভাবে ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল ও পরবর্তীতে ভোটের কথা ভেবে মৌলবাদী শক্তির সাথে আওয়ামী লীগের দহরম মহরম দেখে তাকে ত্যাগ করেছে, সেটাই ঘটতে পারে নিউ ইয়র্কে যদি মামদানি সোরসের বলয়ে পড়ে। সেটা যাতে না হয় সেজন্যেই আমেরিকার প্রগতিশীল তরুণ সমাজকে মামদানির পেছনে থাকতে হবে, তাঁকে রক্ষা করতে হবে মৌলবাদী শক্তির হাত থেকে। একমাত্র সেটা হলেই সেখানে বাংলাদেশের মত দক্ষিণপন্থী শক্তি ক্ষমতায় আসতে পারবে না যদিও ট্রাম্প ইতিমধ্যেই এসে গেছেন। দেশ গড়ে রাজারা, তবে রাজাকে প্রজাদের মন মত দেশ গড়তে বাধ্য করতে পারে একমাত্র প্রজারাই।
সেদিন দেখলাম মামদানি ট্রাম্পের সাথে দেখা করলেন আর ট্রাম্প ফ্যাসিস্ট কিনা সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে দ্বিধা করলে ট্রাম্প নিজেই বললেন, বল বল, আমি কিছু মাইন্ড করব না। বর্তমান রাজনীতির এই এক বৈশিষ্ট্য – সব দল অবরাম নির্বাচনী মাঠে থাকে। নির্বাচনের পরে যখন সবাই মিলে দেশ গড়ার কথা, তখনও পরবর্তী নির্বাচনের কথা ভেবে প্রতিটি দল অন্যদের পথে কাঁটা ছড়ায় আর এতে দিনের শেষে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয় ভোটাররা। এটা প্রায় সারা বিশ্বেই। কবে যে রাজনৈতিক দল ও তাদের নেতারা প্রাপ্ত বয়স্ক হবে আর নির্বাচন নির্বাচন না খেলে সত্যিকার অর্থেই দেশ ও দশের জন্য কাজ করবে!

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো