বিজন ভাবনা

বিজন ভাবনা (১৯): ভাষা – শিক্ষা – সংস্কৃতি

-বিজন সাহা

দেশে প্রাইমারী স্কুল থেকে গান ও শরীর চর্চা উঠিয়ে দেয়া হচ্ছে, অন্তত এসব বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ করা হয়েছে। অন্য দিকে নারী অধিকার নিয়ে যে সমস্ত প্রস্তাব এসেছিল তা আমলেই নেয়নি সরকার বরং নারীদের গৃহবন্দী করার বিভিন্ন আলামত দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে লেখালেখি হচ্ছে, হবে। ভারতবর্ষের ইতিহাস যে খুব ভালো জানি সেটা বলব না, যদিও জানার চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। জ্যাকসনের ভারতের ইতিহাস, নেহেরু, গান্ধী, সুভাষ বসু, মাওলানা আজাদ, রামচন্দ্র গুহ, রমিলা থাপ্পার সহ অনেক বিখ্যাত লেখকদের বই পড়েছি তবে সেটা যথেষ্ট নয়। এছাড়া রামায়ণ, মহাভারত, বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপন্যাস তো আছেই আর আছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রথিতযশা লেখকদের গল্প উপন্যাস। আমার বিশ্বাস ভাল লেখকেরা সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক (সাইকোলজিক্যাল) চরিত্র যেভাবে তুলে ধরতে পারেন অন্য কেউ সেটা পারে না। আর মানুষের ইতিহাস না জেনে শুধু রাজারাজরাদের ইতিহাস কি কখনও সম্পূর্ণ হয়? সোভিয়েত ইউনিয়ন ও রাশিয়ার থাকার ফলে যুদ্ধের উপর অনেক গল্প উপন্যাস পড়েছি, সিনেমা দেখেছি। সেসবে কিন্তু নেতাদের কথা নেই, আছে শুধুই সাধারণ মানুষের কথা। তা সে “মানুষের মত মানুষ” হোক বা “মানুষের ভাগ্য” হোক বা “বলাকারা উড়ে যায়” হোক। সব জায়গায় সাধারণ মানুষের জীবনের দুঃখ কষ্টের কথা, তাদের জীবনের জয়গান। আর এজন্যেই হয়তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তার বিভীষিকা যেকোনো ইতিহাসের চেয়ে অনেক ভালো ভাবে জানতে ও বুঝতে পেরেছি। যাহোক, ইতিহাস, গল্প, মাইথলোজি এসব পড়ে আমার যতদূর মনে হয়েছে ভারতবর্ষে কখনোই ধর্মীয় শাসন ছিল না। বিভিন্ন সময়ে, বিশেষ করে বৌদ্ধ রাজ্যে ধর্মের প্রভাব থাকলেও রাজকার্য চলত রাজ্যের নিময়ে। একই ঘটনা ঘটেছে সুলতানি ও মুঘল আমলে। ইংরেজদের হাত ধরে এদেশে আসে ইউরোপীয়  বিচার ও প্রাশাসনিক ব্যবস্থা। সেই আলোকে ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছিল প্রথম থেকেই ইতিহাসের উল্টো পথে যাত্রা। ইসলাম ধর্মের অভ্যুদয়ের পরে একটা সময় পর্যন্ত আরব ও মধ্য এশিয়ায় এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলেও সবক্ষেত্রেই স্থানীয় সংস্কৃতি গুরুত্ব পেয়েছে এবং স্থানীয় ও আরবীয় এই দুই সংস্কৃতি একে অন্যকে সমৃদ্ধ করেছে। ভারতবর্ষেও ব্যতিক্রম ঘটেনি, বিশেষ করে স্থাপত্যে সেটা দৃশ্যমান। যদি ইসলামের সেই বিজয়ের যুগে অধিকাংশ দেশেই ইসলাম সেসব দেশের একমাত্র বা প্রধান ধর্মে পরিণত হয়, ভারতবর্ষে সেটা হয়নি। এর কারণ মনে হয় এখানে সমাজের প্রান্তিক জনতার একটি বড় অংশ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেও উঁচু শ্রেণীর বেশিরভাগ ধর্মত্যাগ করেনি। শুধু তাই নয় কী সুলতানি আমলে, কী ব্রিটিশ আমলে – উঁচু তলার হিন্দুরা সমাজে তাদের অবস্থান ধরে রাখে দ্রুত নতুন রাজের প্রাশাসনিক কাজে সম্পৃক্ত হয়ে। যতদিন ইসলাম রাজার ধর্ম ছিল ততদিন স্থানীয় মুসলমান নিজেদের রাজার বংশধর বলে মনে করেছে। কিন্তু ইংরেজরা দেশে এক ধরণের গণতন্ত্রের সূচনা করায় সেটা আর সম্ভব ছিল না অবিভক্ত ভারতবর্ষে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল বলে। আর তাই প্রয়োজন ছিল ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র যা শুধু ব্রিটিশ ভারত নয়, প্রাক ব্রিটিশ যেকোনো শাসনের তুলনায় পশ্চাতমুখী ছিল। আর এ কারণেই কী পাকিস্তানে, কী বাংলাদেশে আমরা সামাজিক ভাবে উল্টো পথে চলছি। এখানে মনে রাখতে হবে এমনকি ব্রিটিশ ভারতেও সামাজিক কাজকর্ম যেমন বিবাহ, সম্পত্তির উত্তরাধিকার এসব হত হিন্দু বা ইসলামি আইনে আর বিচার হত রাষ্ট্রের আইনে। শিক্ষাও ছিল এই রাষ্ট্রীয় আইনের ভিত্তিতে, যদিও মাদ্রাসা ও টোল শিক্ষাও ছিল। দেশ ভাগের পর ভারত যদি ব্রিটিশদের তৈরি ব্যবস্থাকে আধুনিক করার চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে উল্টো ধর্মীয় অনুশাসন (শরিয়া আইন) ও ধর্মীয় শিক্ষা আরও বেশি করে জেঁকে বসেছে। ফলে অর্থনৈতিক ভাবে কখনও কখনও এগিয়ে গেলেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে আমরা বারবার পিছিয়ে পড়েছি। এখন মনে হয় সেটা ক্রিটিক্যাল সীমারেখা পাড় হয়ে গেছে। ফলে এখন দেশে খুব সহজেই শারিয়া আইনের পক্ষে শুধু বলাই যাচ্ছে না, তা বরং কার্যকর করা যাচ্ছে। এর শুরু আজ নয়, প্রতিটি সরকার বিভিন্ন সময়ে ছাড় দিতে শুরু করেছে। আর এর ফলে মৌলবাদী মোল্লাতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে। তাই এসব ঘটনা আজ আর নতুন কিছু নয়।

পড়ুন:  বিজন ভাবনা (১৮): বিপ্লব প্রতিবিপ্লব  - বিজন সাহা

পাকিস্তানের জন্ম দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে যার সহজ প্রকাশ হিন্দু বিরোধিতা যেটা পরবর্তীতে ভারত বিরোধিতার রূপ নেয়। বাংলাদেশের জন্মের মূল কারণগুলোর অন্যতম মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বাঙালি মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণীর মুসলমান হিসেবে দেখা। যে সাম্যের বাণী নিয়ে ইসলাম এসেছিল পশ্চিমাদের এই ব্যবহার ছিল তার সঙ্গে সংঘর্ষপূর্ণ। এছাড়া ছিল অর্থনৈতিক শোষণ। মূলত এই অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির জন্য বাঙালি লড়াই করেছে আর এই সংগ্রাম বিভিন্ন জন বিভিন্ন ভাবে দেখেছে। একদল পাকিস্তানের ভেতরেই সমাধান খুঁজেছে, আরেক দল পাকিস্তানের ফিজিক্যাল উপস্থিতির অবসান চাইলেও সেই আদর্শের বলয় থেকে বেরুতে চায়নি। আবার একদল পাকিস্তানের আদর্শের বাইরে এক আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা ভেবেছে। চাপিয়ে দেয়া মুক্তিযুদ্ধ ও তাতে ভারতের ভূমিকার কারণে নতুন অবজেক্টিভ রিয়ালিটি সৃষ্টি হয়েছে। এর হাত ধরে এসেছে বাহাত্তরের সংবিধান। বিশেষ করে তার ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। এটা আদর্শের দ্বন্দ্ব যা থেকে আমাদের মুক্তি নেই। দেশে কোন আদর্শ প্রাধান্য লাভ করবে সেটা নির্ভর করবে শিক্ষার উপর। এখানে আপোষের কোন সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ ভোটের চিন্তা করে আপোষ করতে গিয়ে আর মুক্তিযুদ্ধ ও বুদ্ধিজীবীদের দলীয়করণ করতে গিয়ে এই লড়াইয়ে হেরে গেছে।
গণিতে ইউনিয়ন ও ইন্টারসেকশন বলে দুটো ধারণা আছে। ইউনিয়ন হল বিভিন্ন সত্তার কমন ও আনকমন সবটা। ইন্টারসেকশন হল শুধু যা কমন সেটা। যেমন একজন বই পড়তে আর ছবি তুলতে ভালবাসে, অন্যজন ভালবাসে বই পড়তে আর ফুটবল খেলতে। বই পড়া তাদের কমন। এটা তাদের ইন্টারসেকশন। এ নিয়েই তাদের বন্ধুত্ব হতে পারে যদি তারা ছবি তোলা ও ফুটবল খেলাকে মেনে নিতে পারে। এটা হবে ইউনিয়ন। কিন্তু যদি একজন ফুটবল খেলা (বা ছবি তোলা) দুই চোখে দেখতে না পারে, তাদের বন্ধুত্ব বেশিদিন টিকবে না। হয় তাদের একজন অন্যজনকে বাধ্য করবে তার সাথে চলতে অথবা তাদের পথ দু’ দিকে বেঁকে যাবে। পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে ইসলাম ধর্ম কমন হলেও আনকমন বিষয় কম ছিল না। ভূমির কথা বাদই দিলাম। যখন পশ্চিম পাকিস্তান ভাষার উপর আঘাত করল তখন আর এই দুই অংশ ইউনিয়ন থাকল না। কারণ ভাষা যেকোনো জাতির ধর্মের চেয়েও অনেক বেশি অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য। আর যেহেতু ভাষাকে ঘিরেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে উঠেছে তাই এখানে ধর্মের ভূমিকা গৌণ হবে সেটাই স্বাভাবিক। কারণ ভাষা ছিল হিন্দু মুসলমান সবার। তাই মুক্তিযুদ্ধের, যা ছিল ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতা, অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হবে ধর্মনিরপেক্ষতা এতে অবাক হবার কিছু নেই। অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতা যেমন ধর্মহীনতার সাথে গুলিয়ে ফেলে তেমনি অনেকে এটাকে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে দরকষাকষি ভাবে যদিও দেশে এই দুই সম্প্রদায়ের বাইরেও বিভিন্ন সম্প্রদায় আছে। অবিভক্ত ভারতেও সেটা ছিল। বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি, শিখ, খ্রিস্টান এসব সম্প্রদায়ের উপস্থিতি সত্ত্বেও এবং দেশের অর্থনীতিতে পার্সি সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান থাকার পরেও শুধুমাত্র সংখ্যার কারণে হিন্দু আর মুসলমানরাই দেশ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছে। এ জন্যেই হয়তো সব সিস্টেমে কিছু ডোমিনিটিং ফিগার থাকতে হয়। তবে সে যদি অন্যদের অধিকারের প্রতি যত্নশীল না হয় তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন তৈরি হয় অথবা দেখা দেয় সামাজিক অসন্তোষ, অস্থিরতা। এজন্যে শুধু ধর্ম নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা অন্য যেকোনো ইস্যু সামনে চলে আসতে পারে। আমাদের সমাজে শুধু ধর্ম নয় অন্যান্য অনেক প্রশ্নেই এন্টাগোনিস্টিক দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। এখান থেকেই একাত্তরকে নিয়ে এত বিতর্ক যা দেশকে স্বাধীনতার পক্ষের ও বিপক্ষের দুই দলে বিভক্ত করেছে। এটা হয়েছে সবার উপরে দেশ ও মানুষ – এই সত্যটা উপলব্ধি করতে রাজনৈতিক দলগুলো ব্যর্থ হয়েছে বলে।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো