বিজ্ঞান ভাবনা (২০৭): যুদ্ধের সেকাল একাল-বিজন সাহা

যুদ্ধের কথা শুনলেই মনে পড়ে রাজা বাদশাহদের কথা। যুদ্ধ মানেই তলোয়ারের ঝনঝনানি। ছোটবেলায় বাড়িতেই যাত্রার দল ছিল। অনেক দিন রিহারসেল চলত। গ্রামে আসত যাত্রার দল বিভিন্ন পালা নিয়ে – প্রথম পানি পথ পালায় রানা সংগ্রাম সিংহের সাথে ইব্রাহিম লোদির বা ইব্রাহিম লোদির সাথে বাবুরের লড়াই। এমনকি আমরা নিজেরাও বাঁশের বা কাঠের তলোয়ার তৈরি করে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম।
তখন যুদ্ধ ছিল আসলে বীরত্ব প্রকাশের সুযোগ। অনেক সময় রাজা বা সেনাপতিরা যুদ্ধের মাঠে নিজ নিজ বীরত্ব প্রকাশ করতেন। হত সম্মুখ সমর যখন দুই রাজা বা সেনাপতি পরস্পরের বিরুদ্ধে তলোয়ার বা তীর ধনুক হাতে যুদ্ধ করতেন। গোলাবারুদ আবিষ্কারের পর থেকে সেই যুদ্ধ পরিণত হয় সামরিক কৌশলে। সেদিক থেকে ট্রয়ের যুদ্ধে একিলিউস, হেক্টর, অ্যাজাক্স, আগামেনন, অডিসিউস এরা যদি নিজস্ব বীরত্ব প্রদর্শন করে থাকেন তাহলে ট্রয়ের ঘোড়া ছিল যুদ্ধের কৌশলগত দিক। এরপর নেপোলিয়ন, সুভরভ, কুতুজভ, নেলসন আরও অনেকেই সমর কৌশলে দক্ষতা দেখিয়েছেন যেমন দেখিয়েছেন ঝুকভ, রাকাসভস্কি ও অনেকে। তবে এসব যুদ্ধে সেনাপতিরা একটা নিয়ম মানার চেষ্টা করেছেন, প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন। কিন্তু বর্তমান ইসরাইল ইরান যুদ্ধে এমন অনেক কিছু ঘটেছে যাকে ঠিক বীরত্ব বলা চলে না। দীর্ঘ দিন ধরে ইরানের ভেতরে ড্রোন বাহিনী গড়ে তোলা, অকস্মাৎ আক্রমণ করে সে দেশের সেনা বাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের হত্যা করা সেটা যুদ্ধের নীতির সাথে যায় না, যেমন যায় না ট্রাম্পের বিনা ঘোষণায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ। সাধারণত চোর ডাকাত অকস্মাৎ আক্রমণ করে, তবে দেশ যা কিছু আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ মেনে চলে তাকে অবশ্যই যুদ্ধের নিয়ম মেনে চলতে হয়। এসব আইনের মধ্যে পড়ে নিরীহ জনগণকে নির্বিচারে হত্যা না করা। কারণ এটা শুধু স্বাভাবিক নীতি লঙ্ঘন নয়, মানবতার প্রতি হুমকি। বিষয়টা কেউ ইরানের মোল্লাবাদী শাসনের পক্ষে না বিপক্ষে সে প্রশ্ন নয়, এটা মানব জাতির নিরাপত্তার প্রশ্ন। এর কিছুদিন আগে রাশিয়ায় এভাবে ড্রোন আক্রমণ করা হয়েছিল। এ থেকে স্পষ্ট যে পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘ দিন ধরে এ রকম সুযোগ খুঁজছে। প্রায় প্রতিটি দেশেই সরকার বিরোধী লোকজন পাওয়া যাবে। এদের হাত দিয়েই এতদিন বিভিন্ন ধরণের রঙিন বিপ্লব চালানো হয়েছে। বিভিন্ন দেশে, এমনকি বাংলাদেশে স্নাইপার ব্যবহার করা হয়েছে। সেখানে প্রচুর লোক হতাহত হয়েছে। এখন যদি ড্রোন ব্যবহার করা হয় এসব সিজনাল বিপ্লবের অবস্থা কোন দিকে মোড় নেবে সেটা কল্পনা করা যায়? ড্রোন তৈরি আজকাল অনেকটা ঘরে বোমা তৈরির মত যা দুই শ বছর আগেও মানুষ করত। যদি কোন রাষ্ট্র এ রকম পদ্ধতি অবলম্বন করে তাহলে সেটা ভবিষ্যতে যেকোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যই হুমকি স্বরূপ হবে। যেকোনো সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ এভাবে তাদের অনুসারীদের দ্বারা বিভিন্ন দেশে খুব অল্প খরচে এ ধরণের আক্রমণ চালাতে পারে। কয়েক দিন আগে বেলারুশে একদল ভিন্নমতাবলম্বী ধরা পড়ে যারা ড্রোন ব্যবহার করে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিল। জানা যায় একাধিক পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থা তাদের সাহায্য করেছিল এই আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা করায়। ইরানে পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র বা বেলারুশে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র – এসব তো যে সে জিনিস নয় যে চাইলেই কোন রকম দুর্ঘটনা ছাড়া উড়িয়ে দেয়া যায়। আর এর ফল শুধু সেই দেশ নয় বিশ্বের অনেক দেশই ভোগ করবে।
বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক দাবি দাওয়া আদায় করার জন্য বিমান ছিনতাই করা হয়। এরপর আসে ২০০১ এর ১১ সেপ্টেম্বর। এ ধরণের প্রতিটি ঘটনা অন্যদের জন্য নজীর তৈরি করে, নতুন পথ খুলে দেয়। সন্ত্রাসবাদীরা কোন নিয়মের তোয়াক্কা করে না। কিন্তু কোন রাষ্ট্র যদি এর পেছনে থেকে ইন্ধন যোগায় সে নিজেকে সান্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে। বর্তমানে যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে প্রায় নিশ্চিত ভাবেই বলা চলে যে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মে লিপ্ত। আর যখন খেলার কোন নিয়ম থাকে না তখনই শুরু হয় অরাজকতা। এই অরাজকতা হয়তো কোন দেশ বা দেশের ভেতরে কোন কোন সংস্থাকে লাভবান হতে সাহায্য করে কিন্তু সেটা যে বিশ্ব পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাশিয়ায় «ভোরি ভ জাকনে» অর্থাৎ আইন মেনে চলা চোর বলে একটা ধারণা আছে। এরা আসলে সমাজে সম্মানিত মানুষ, আইন মেনে চলে বিভিন্ন ব্যবসা বানিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। অনেকটা মাফিয়ার মত। এরাও বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে সমস্যা তৈরি হলে সভা করে সেসব মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করে অস্ত্র হাতে নেবার আগে। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে অনেক দেশই আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের সমস্যা সমাধানে আগ্রহী নয়, উল্টো প্রতিপক্ষকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। কোন দেশকে আইসোলেট করার প্রচেষ্টা প্রায়ই আলোচনার পথ রুদ্ধ করে। তখন বল প্রয়োগ সমস্যা সমাধানের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়ায়। তবে আশার বিষয় ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের পর প্রথম বারের মত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টকে ফোন করে ইউক্রেন ও ইরান ইসরাইল যুদ্ধ নিয়ে কথা বলেছেন। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের রাশিয়াকে আইসোলেট করার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। তারা স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে বিশ্বের অনেক সমস্যাই রাশিয়া ছাড়া সমাধান করা সম্ভব নয়। আবার একই সাথে রাশিয়াকে ন্যাটোর প্রধান শত্রু হিসেবে ঘোষণা ও পূর্ব ইউরোপে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বসানোর পরিকল্পনা, ফিনল্যান্ড সীমান্ত বরাবর ন্যাটোর অত্যাধুনিক ইলেক্ট্রনিক প্রযুক্তি বসানো ইউরোপে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ায় বই কমায় না। উল্লেখ করা যেতে পারে যে ইউক্রেন আক্রমণের পর ফিনল্যান্ড ও সুইডেন ন্যাটোর সদস্য হয়। অনেকের ধারণা এতে রাশিয়া ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা এই যে এই দুই দেশের সাথে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সম্পর্ক সব সময়ই ভালো ছিল আর যুদ্ধ লাগলে এরা খুব সম্ভব ন্যাটোর সাথেই যোগ দিত। সেক্ষেত্রে বরং তুলনামূলক ভাবে অরক্ষিত সীমান্তে রাশিয়া আরও বেশি বিপদে পড়ত। এদের ন্যাটোর সদস্য হবার ফলে রাশিয়া নিজেও এই সীমান্তগুলো শক্তিশালী করছে। সেসব বিবেচনায় ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি এখনও সুদূরপরাহত। যদিও আমেরিকা ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ আপাতত স্থগিত রেখেছে সেই ক্ষতি পূরণ করছে ইউরোপ। লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন কিয়েভকে মুক্ত হস্তে অস্ত্র দান করার কাজে নেমেছে। বার্লিন ইউক্রেনকে টাউরুস ক্ষেপণাস্ত্র দেবার কথা ঘোষণা করেছে। এ ক্ষেত্রে জার্মানি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে বলে পুতিন ঘোষণা করলে চ্যান্সেলর মেরজ বলেছেন এখন থেকে জার্মানি আগে থেকে ইউক্রেনকে অস্ত্র দেবার ব্যাপারে ঘোষণা দেবে না, তবে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখবে। তাই এর আগে যেমন ইউরোপ মিনস্ক চুক্তি করে গোপনে কিয়েভকে অস্ত্র সজ্জিত করেছে এখনও তারা সেই পথেই যাবে। অবস্থা এমন যে তারা শেষ ইউক্রেনিয়ান পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। প্যারাডক্স এখানেই। পশ্চিমা বিশ্ব যদি সত্যি সত্যিই ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের মঙ্গল চাইত তাহলে তাদের প্রথম লক্ষ্য হত যুদ্ধ বন্ধ করা যাতে শত শত ইউক্রেনবাসীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। মনে আছে ইনুকভিচের সময়ে পশ্চিমা বিশ্ব সেখানে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল যেখানে এই মৃত্যু যজ্ঞে ইতিমধ্যে কয়েক শ’ বিলিয়ন ডলার আহুতি দিয়েছে। ২০১৩ সালে ইউক্রেনের জিডিপি ছিল ২২০ বিলিয়ন ডলার, বর্তমানে এদের বাজেটের ৬০% আসে বিদেশী অনুদান থেকে। স্বৈরাচারের আমলে দেশের জিডিপি বর্তমানের চেয়ে বেশি ছিল, এখন দেশ আবার ধীরে ধীরে আইএমএফের কাছে ঋণী হচ্ছে। এটাই পশ্চিমা বিশ্বের প্রধান অস্ত্র। ঋণ দিয়ে মক্কেলকে বিভিন্ন শর্তে বিভিন্ন ছাড় দিতে বাধ্য করা। আমরা ইউক্রেন থেকে শিক্ষা নিতে পারি। কারণ ইনুকোভিচকে তাড়ানোর অল্প দিনের মধ্যেই ইউক্রেনের অর্থনীতি ডিগবাজি খায়, দেশ ক্রমাগত পশ্চিমা ঋণের নাগপাশে শ্বাসরুদ্ধ হতে থাকে। সমস্যা হল মানুষ নিজের অতীত ইতিহাস থেকেই শিক্ষা নিয়ে চায় না অন্যের ইতিহাস তো দূরের কথা। অথচ ইউক্রেনের ইতিহাস থেকে বিনা মূল্যে শিক্ষা নিয়ে আমরা বাংলাদেশের চলার পথ অনেকটাই ঠিক করতে পারতাম।
যুদ্ধ যে সহসা থামছে না তার একটা ইঙ্গিত মনে হয় এদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন। প্রায়ই ইউক্রেন বা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগীরা ধরা পড়ছে বিভিন্ন নাশকতামূলক কাজ করতে গিয়ে। কিছুদিন আগে হাসপাতালে গিয়ে দেখি একটা তীর চিহ্ন দিয়ে শেল্টার নির্দেশ করা। কিছুদিন আগে দুবনায় ড্রোন আক্রমণ হয়েছিল। তবে সেটা হয়েছিল এখানকার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নির্মাণের কারখানায়। এর পরপরই মেইল পেলাম কীভাবে ড্রোন আক্রমণের সময় শেল্টারে যেতে হবে। এমনকি দেখেও এলাম কোথায় সেই শেল্টার। সোভিয়েত আমলে পারমাণবিক বোমার আঘাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য ভূগর্ভস্থ এসব শেল্টার নির্মাণ করা হয়। এসব দেখে মনে হয় যুদ্ধ বিরতি আলোচনা চালিয়ে যাবার পাশাপাশি এরা দীর্ঘ দিন যুদ্ধ চালাতে হতে পারে এরকম প্রস্তুতিও নিচ্ছে। ইউক্রেনের অনেক বেসরকারি ফ্যাসিবাদী গ্রুপের হাতে অনেক অস্ত্র আছে। তাই অফিসিয়ালি যুদ্ধ বিরতি হলেও যুদ্ধ শেষ হবে বলে মনে হয় না। যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জন্য মৃত্যু, কিন্তু অনেকের জন্য পেশা, অনেকের জন্য কোটিপতি হবার সুযোগ। এত সহজে সেটা অনেকেই হারাতে চাইবে না।
গতকাল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টেলিফোনে মত বিনিময় করেন। প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ইউরি উশাকভ বলেন পুতিন ট্রাম্পকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে মস্কো ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধ বিরতিতে তার দাবি থেকে সরে আসবে না – অর্থাৎ ইউক্রেন জোটনিরপেক্ষ থাকবে, তার অস্ত্র ও সেনা সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত থাকবে, ক্রিমিয়া ও অন্য চারটি প্রদেশ আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত রাশিয়ার অংশ হবে এবং এসব এলাকা থেকে ইউক্রেনের সেনা সরিয়ে নিতে হবে। এসব থেকে মনে হয় রাশিয়া দীর্ঘ দিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে মানসিক ভাবে প্রস্তুত। অনেকের ধারণা আমেরিকা যে ইউক্রেনকে নতুন করে অস্ত্র দিচ্ছে না সেটা যতটা না ট্রাম্পের সুমতির কারণে তারচেয়ে বেশি ইসরাইল ইরান যুদ্ধের পরে আমেরিকায় অস্ত্রের ঘাটতি। যদিও ১৯৪৫ সালের পর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ অব্যাহত ছিল, তারপরেও সেসব যুদ্ধের ইন্টেনসিটি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মত ছিল না। কারণ যুদ্ধটা হচ্ছে মূলত রাশিয়া বনাম ন্যাটো প্লাস। যুদ্ধ লাভজনক হলেও সেটা শুধু বিজয়ীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আর একারণেই ইউরোপ শেষ চেষ্টা করবে এখানে না হারতে। আর এই মনোভাবই যুদ্ধকে দীর্ঘ করবে বলে অনেকের ধারণা।
গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো
