বিজ্ঞান প্রযুক্তি

বিজ্ঞান ভাবনা (২০১): যুদ্ধ ও শান্তি

-বিজন সাহা

ইস্তানবুলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দীর্ঘ দিন বাদে সরাসরি আলোচনার পরে সবার মনে একটাই প্রশ্ন – শান্তি কত দূর? অনেকেই ফোন করে জানতে চায়। কিন্তু শান্তি কি এতই সস্তা কোন জিনিস যে চাইলেই পাওয়া যায়? এর জন্য মূল্য দিতে হয়, উচ্চ মূল্য। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেই মূল্য দিতে হয় জীবন আর রক্ত দিয়ে। অনেকেই জানতে চায় রাশিয়া কি শান্তির জন্য প্রস্তুত? তারা কি শান্তির পক্ষে? কী বলব তাদের? শুধু এই যুদ্ধ নয়, ইউরোপ বা বিশ্বে যদি শান্তির পক্ষে একটি দেশ থাকে সেটা রাশিয়া, এখানকার জনগণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ২৭ মিলিয়ন মানে দুই কোটি ৭০ লাখ লোকের জীবন দিয়ে সেটা তারা উপলব্ধি করেছে। এদেশে খুব কম পরিবারই ছিল যারা কাউকে না কাউকে সেই যুদ্ধে হারায়নি। তাই স্বজন হারানোর ব্যথা এখানে প্রতিটি পরিবার বোঝে। এরা যুদ্ধ চায় না। কিন্তু বারবার এদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়। তাই শান্তি নির্ভর করে তাদের উপর যারা যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। ইউক্রেন নামক দেশটা ধ্বংসের চরম পর্যায়ে। এক মিলিয়ন যুবক যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে, দশ মিলিয়নের বেশি দেশ ছেড়ে চলে গেছে। এসব হয়েছে ইউরোপ, আমেরিকা আর অবশ্যই ইউক্রেনের নেতৃত্বের ভুলে। কিন্তু এদের কাউকে কি কখনো কেউ দায় স্বীকার করতে দেখেছে? এখনো বলে সব দোষ পুতিনের। যারা নিজেদের ভুল বোঝে না বা বুঝতে চায় না তাদের সাথে মতৈক্যে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। আসলে মতৈক্যে পৌঁছানো যায় তখন যখন মতের মিল থাকে। কিন্তু সবাই যদি চুক্তির শর্তগুলো নিজের নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে তখন চুক্তি হয় কীভাবে? এটা বুঝতে তো আমাদের খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। রাশিয়ার সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধ ২০২২ সালে শুরু হলেও দনবাসের সাথে সেটা শুরু হয়েছে ২০১৪ সালে। এক পর্যায়ে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়লে তারা বাধ্য হয় শান্তি চুক্তি করতে। একদিকে ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি, ফ্রান্স ও পোল্যান্ড আর অন্য দিকে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ইউক্রেন ও দনবাস শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করে যা মিনস্ক চুক্তি নামে পরিচিত। সেই চুক্তি মেনে চললে আজ ইউক্রেন চারটে প্রদেশ হারাত না, দশ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটত না। কিন্তু ইউক্রেন এক দিনের জন্যও সেই চুক্তি পালন করেনি, করতে চায়নি। পরে ইউরোপের নেতারা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে এই চুক্তি তারা ব্যবহার করেছে ইউক্রেনকে অস্ত্র সজ্জিত করার জন্য। ২০১৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত ইউক্রেনকে প্রস্তুত করা হয়েছে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য। এমনকি যুদ্ধের শুরুতে যখন রাশিয়া ও ইউক্রেন ইস্তানবুলে শান্তি চুক্তির শর্তগুলোর বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছায় ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের প্ররোচনায় ইউক্রেন পিছিয়ে যায়। তাই সমস্যা রাশিয়ায় নয়, সমস্যা পশ্চিমা বিশ্বে। তাদের বা বলা চলে পশ্চিমা বিশ্বের এলিটদের রুশ বিরোধিতায়। এর শুরু তো আজ নয়। কম করে হলেও পাঁচ শ বছর ধরে চলছে এই বিরোধিতা – কখনও মানসিক, কখনও সামরিক। বার বার ইউরোপ সমস্ত শক্তি দিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করছে আর বার বার পরাজিত হয়ে ফিরে যাচ্ছে। কিন্তু এটা এমন এক নেশা যার কবল থেকে মুক্তি পাওয়া কষ্ট। এটা অনেকটা জুয়া খেলার মত। প্রতিটি হারের পরেই মনে হয় জয় ঠিক পরের দানে, পরের বাজীতে। তাই মানুষ এমনকি সর্বস্বান্ত হয়েও খেলা ছেড়ে উঠতে পারে না। যুধিষ্ঠিরের মত বিজ্ঞ রাজা যখন রাজ্য তো বটেই এমনকি পাঁচ ভাই ও সবশেষে স্ত্রীকে পর্যন্ত বাজী রাখেন সেখানে বর্তমানের ইউরোপের রাজন্য বর্গ কীভাবে নিজেদের সেই লোভ আর মোহ থেকে মুক্ত করবে?

একটা সময় ছিল যখন সংবাদ মাধ্যম রাজনৈতিক ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরত। সাংবাদিকরা দল নয়, দেশের স্বার্থে কাজ করত, তাই প্রয়োজনে সরকারের সমালোচনা করতে পিছ পা হত না। ওয়াটার গেট কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটিত হয়েছিল তাদের হাতেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও তাদের অবদান স্মরণে রাখার মত। তারা সরকার ও জনগণের মধ্যে এক ধরণের ভারসাম্য রক্ষার কাজ করত। কিন্তু সংবাদ মাধ্যম যখন বৃহৎ পুঁজির অধীনে চলে গেছে আর এই বৃহৎ পুঁজিই যখন অন্তরাল থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে তখন হারিয়ে গেছে আগের সেই ভারসাম্য। সংবাদ মাধ্যমের ঘাড়ে চেপে তাই পশ্চিমা বিশ্ব আজ খেয়াল খুশি মত ইতিহাস লিখতে চাইছে। এর সাথে ইউক্রেনের যুদ্ধের সম্পর্ক কি? অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রোপ্যাগান্ডা থেকে শুরু করে সব কিছুর উপর নিরঙ্কুশ মনোপলিই আসলে এই যুদ্ধের মূলে রয়েছে। মনে রাখতে হবে যে রাশিয়া একেবারে শুরু থেকেই তার নিজের নিরাপত্তার কথা বলছে। সে চাইছে শুধু ইউক্রেন নয় সবার নিরাপত্তা। কারণ যখনই কেউ নিজেকে নিরাপত্তাহীন মনে করে তখন আজ হোক কাল হোক তা যুদ্ধের রূপ নেয়। যুদ্ধের শুরু শুধু শক্তি থেকেই হয় না, দুর্বলতা থেকেও হয়। নিজেদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই রাশিয়া ইউক্রেনের নিরপেক্ষতা দাবি করেছিল, একই কারণের সে ন্যাটোর সম্প্রসারণে আপত্তি জানিয়েছিল।

সেই বিচারে শান্তি চুক্তি হলেও সেটা খুব সহজে হবে বলে মনে হয় না। কারণ চোরের আর গৃহস্থের মধ্যে কখনো সমঝোতা হয় না, সেটা হয় না তাদের পরস্পর বিরোধী স্বার্থের কারণে। ধরা পড়লে চোর আর কোনদিন চুরি করবে না বলে নাকে খৎ দিতে পারে কিন্তু ছাড়া পেলে প্রথম সুযোগেই চুরি করে। এটা তার পেশা। ঠিক এই কথাই বলা যায় সেই দুই পক্ষ সম্পর্কে যুদ্ধ ও শান্তি যাদের অস্তিত্বের সমার্থক। রাশিয়া আর ইউক্রেনের যুদ্ধ সম্পর্কে, যা আসলে রাশিয়া বনাম ইউরোপ আমেরিকার যুদ্ধ, ঠিক এই কথাই বলা যায়। এসব দেশের এলিটদের এক বড় অংশের ধারণা যে রাশিয়া অন্যায় ভাবে এত সম্পদ নিজের দখল রেখেছে। এই একই কথা তারা কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কে বলে না যদিও জনসংখ্যার তুলনায় এদের সম্পদ ও দেশের আয়তন রাশিয়ার চেয়ে কম নয় বরং বেশি। কারণ? কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া সব অর্থেই তাদের নিজ বংশের, রাশিয়া সব সময়ই প্রতিপক্ষ তা সেখানে রাজতন্ত্রই থাক, সমাজতন্ত্র বা পুঁজিবাদই থাক। তাই দীর্ঘ দিন থেকেই পশ্চিমা এলিটদের একাংশ রাশিয়া ভাঙতে চাইছে যাতে এ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ করতে সুবিধা হয়। এ দেশের মানুষের সুখ বা অধিকার নয়, এদের দরকার রাশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ। যেভাবে আফ্রিকার সম্পদ তারা শোষণ করেছে ঠিক সেভাবেই রাশিয়ার সম্পদ শোষণ করতে চায়। হয়তো দুর্বল শাসক পেলে সেটা সম্ভব, কিন্তু রাশিয়া বিশাল এক দেশ, তাই একে অখন্ড রেখে সেটা করা সম্ভব নয়। ইউক্রেনের যুদ্ধ সে দেশের মানুষের জন্য নয়। ন্যুল্যান্ড যে ৫ বিলিয়ন ডলার ইউক্রেনে রুশ বিরোধী সাইকোলজি তৈরি করতে ব্যয় করেছে তার অর্ধেক ব্যয় করে এদেশের শিল্প দাড় করাতে পারত, তাতে দেশ, জনগণ সবাই উপকৃত হবে। ইউক্রেনকে দেবার জন্য তখন এক বিলিয়ন ডলার ছিল না, এখন যুদ্ধের জন্য শত শত বিলিয়ন ডলার ছাপা হচ্ছে। তাই সমস্যা অন্যত্র। এই যুদ্ধে কারা মারা যাচ্ছে? মূলত জাতিগত ভাবে যারা রুশ তারা। দুই পক্ষেই। একটু চিন্তা করলেই টের পাব যে এটা ডিভাইড অ্যান্ড রুল ব্যতীত আর কিছুই নয়।

পড়ুন:  বিজ্ঞান ভাবনা(২০০): সম্পর্ক – অলীক ও বাস্তব -বিজন সাহা

অনেকেই বলে বা ভাবে পুতিন না থাকলেই সবকিছু আগের মত হয়ে যাবে। আমার তা মনে হয় না। আমরা যারা আশির দশকের শুরুর দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছি তখন দেখেছি প্রচলিত ব্যবস্থা বিশেষ করে দোকানে পণ্যের অভাব নিয়ে মানুষের মনে ক্ষোভ ছিল। বেশির ভাগ মানুষ চেয়েছিল সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গোলা ভরা ধান, গোয়াল ভরা গরু আর রকমারি ও কোয়ালিটি পণ্যে বোঝাই দোকান। তারা পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিল আর তাই গর্বাচেভের পেরেস্ত্রোইকা আর গ্লাসনস্ত লুফে নিয়েছিল। এই মানুষই আবার গর্বাচেভের সিদ্ধান্তহীনতায় অতিষ্ঠ হয়ে ইয়েলৎসিনকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল পার্টির ব্যাপক বিরোধিতা সত্ত্বেও। ১৯৯৬ সালে ভোটে কারচুপি না হলে যুগানভ খুব সম্ভবত রাশিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হতেন। পুতিন ঠিক এভাবেই পুতিন হয়েছেন। মানুষের চাহিদা তাকে এ পথে এনেছে। তাই যতদিন স্বাধীনতার জন্য, স্বশাসনের জন্য, স্বাধিকারের জন্য মানুষের চাহিদা থাকবে ততদিন পুতিনরা আসবে। এটা অবজেক্টিভ রিয়ালিটি। দিনের শেষে দেশের মানুষই সব করে। তবে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে কি হবে না সেটা নির্ভর করে যাদের হাতে তারা দায়িত্ব অর্পণ করে তাদের যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার উপর। তাহলে? শান্তি কি আসবে না? রাশিয়া বারবার বলছে তারা সেই শান্তি চায় না যা নতুন করে যুদ্ধের জন্ম দেয়, তারা সেই শান্তি চায় যা দীর্ঘ কালের জন্য যুদ্ধের সম্ভাবনা নাই করে দেয়। সেই লক্ষ্য অর্জনে তারা প্রস্তুত – সেটা শান্তি চুক্তির মাধ্যমেই হোক আর যুদ্ধের ময়দানেই হোক। যেহেতু ইউক্রেন ক্রমাগত রাশিয়ার বেসামরিক স্থাপনার উপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে, তাই এখন তারা আরও বেশি করে ইউক্রেনের ভেতরে ঢুকছে বাফার জোন তৈরি করতে। আর ইউরোপ? তারা যুদ্ধ ডেকে আনছে নিজেদের দেশে। এটাই মনে হয় এখন বর্তমান এলিট শ্রেণির টিকে থাকার একমাত্র উপায়। ক্ষমতায় টিকে থাকাই যখন একমাত্র উদ্দেশ্য হয় – তখন যুদ্ধ খুব ভয়ঙ্কর কিছু নয়। যুদ্ধে তো এলিটদের সন্তান মারা যায় না, মারা যায় সাধারণ মানুষ। তবে ভয়ের বিষয় হল যুদ্ধের দামামায় জার্মানি নিজেকে অস্ত্র সজ্জিত না করে। তাদের বর্তমান এলিটদের এক বিরাট অংশ উচ্চপদস্থ নাৎসি নেতাদের উত্তরসূরি যারা প্রতিশোধ নেবার জন্য বসে আছে। ভুলে গেলে চলবে না যে জার্মানি গত শতাব্দীতে দুই দুটো বিশ্বযুদ্ধ লাগিয়েছিল। আরও একটা যে লাগাবে না সেই গ্যারান্টি কে দেবে? আমাদের চোখে ইউরোপ, এমনকি আমেরিকা যত উন্নত, যত শিক্ষিতই হোক না কেন বিশ্ব শান্তিতে তাদের অবদান কখনোই খুব বেশি ছিল না, নেই। তাদের সব ঘুরে নিজেদের রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব দেশের জনগণ সরকারকে সমর্থন করে। তাই যুদ্ধ আরও কতদিন চলবে বা আদৌ চলবে কি না সেটা নির্ভর করবে মূলত ইউরোপের অদূরদর্শী এলিট শ্রেণির উপর।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো