বিজ্ঞান প্রযুক্তি

বিজ্ঞান ভাবনা (১৫৩):ভারতে নির্বাচন ও আমরা

– বিজন সাহা

এবার বিশ্বজুড়ে নির্বাচনের বাম্পার ফলন। বাংলাদেশ দিয়ে শুরু। এরপর রাশিয়া, ভারত, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, সামনে আমেরিকা – এক কথায় নির্বাচনী ম্যারাথন। যদিও কোন নির্বাচন খুব যে একটা ফলো করি তা নয়, তবে নির্বাচন শেষের ফলাফল দেখি। কারণ নির্বাচনী ফলাফলের উপর শুধু সেসব দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বিশ্ব রাজনীতির গতিবিধি অনেকটাই নির্ভর করে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নির্বাচনে বাম ও দক্ষিণপন্থীরা আগের চেয়ে ভালো করলেও সেখানে সেন্ট্রিস্টরাই ক্ষমতায় রয়ে গেছে। তাই যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কোন পরিবর্তন হবে বলে হনে হয় না। সেদিক থেকে ভারতের বিদেশ নীতিতেও তেমন পরিবর্তন হবে না। ভারতে যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ইউরোপ আমেরিকার নয়, নিজেদেরদেশেরস্বার্থকেইসবচেয়েবেশিগুরুত্বদেয়।তবেআজভারতেরনির্বাচননিয়েদুটোকথাবলবযাআমাদেররাজনীতিরসাথেজড়িত।

আমি যে ভারতের নির্বাচন খুব একটা ফলো করেছি তা নয়। মাঝেমধ্যে ফেসবুকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন ঘটনা দেখে বিরক্ত হয়েছি আর ভেবেছি বাংলা দুই ভাগে বিভক্ত হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের কমবেশি এক, দুই বাংলায়ই প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ একেবারে শূন্যের কোঠায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রার্থীদের মারামারি, রাজনৈতিক হত্যা এখন কমন চিত্র। তারপরেও আমার মনে হয় ভারতের নির্বাচন থেকে আমাদের কিছু কিছু বিষয় শেখার আছে। ১৯ এপ্রিল ২০২৪ থেকে ০১ জুন ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় দেড় মাস ধরে এই নির্বাচন সাতটি ধাপে সংগঠিত হয়। শুধু নির্বাচন পরিচালনা করাই সেদিক থেকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তারপরেও ভারত বার বার কমবেশি সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচন করে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিকূলতার পরেও সমস্ত বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হলেও কোন অজুহাত দাড় করিয়ে নির্বাচন বয়কট করেনি। সেটা আমার মনে হয় ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর ম্যাচুরিটির পরিচয় দেয়। কারণ সরকারি বা অন্যান্য দলের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি সব রাজনৈতিক দলের নিজ নিজ সমর্থকদের প্রতিও কিছু দায়িত্ব থেকে যায়। এসব দায়িত্বের একটি হল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নিজেদের সমর্থকদের তাদের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করার সুযোগ দেয়া। শক্তিশালী দল খেলায় জিতবে, কোন অজুহাতে তাকে ওয়াকওভার দিয়ে সেই দলের জয় রহিত করা যায় না, কিন্তু দর্শকদের খেলা দেখার আনন্দ থেকে বঞ্চিত করা যায়। যেখানে বিজেপি জোট এবার ৪০০ আসন পাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছিল, সেখানে পেয়েছে ২৯৩ যা গতবারের চেয়ে কম। বিরোধী জোট শত সমস্যার মধ্যেও দেখিয়েছে তারা সব কিছুর পরেও বিজেপির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে, কিছুটা হলেও দেশের রাজনৈতিক স্রোত ঘুরিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো এ থেকে শিক্ষা নিতে পারে। কতটুকু সত্য সেটা জানি না তবে ফেসবুকে একটি লেখা থেকে জানলাম “বিজেপি ৭টা সিট ২০০ ভোটের মার্জিনে জিতেছে, ২৩টা সিট ৫০০ ভোটে, ৪৯ টা সিট ১০০০ ভোটে ও ৮৬টা সিট ২০০০ ভোটে জিতেছে।” এখানে কেউ বিজেপির কারচুপি দেখতে পারেন, তবে আমার মতে বিজেপির কারচুপি না খুঁজে এটাকে বিরোধী দলের শক্তি হিসেবে দেখাই ভালো আর ভবিষ্যতে কীভাবে এই ছোট ছোট গ্যাপগুলো পূরণ করা যায় সে বিষয়ে এখন থেকেই কাজ শুরু করা উচিৎ। আমরা বেশির ভাগ সময়ে নিজেদের দুর্বলতা না খুঁজে, নিজের দুর্বলতা দূর করার চেষ্টা না করে অন্যদের দোষ খুঁজে দিন কাটিয়ে দেই। তাতে আর যাই হোক নিজে শক্তিশালী হওয়া যায় না। অন্যের দুর্বলতার উপর নিজের সাফল্য গড়ার কৌশল নেগেটিভ মনোভাব। জয়ের জন্য নিজেকে শক্তিশালী করে তৈরি করাই উত্তম উপায়। তাই এমনকি যদি এসব আসনে বিজেপি কারচুপি করেও জেতে সেটা বিরোধী দলকে ভবিষ্যতের আলো দেখায়। এ নিয়ে আদালতে যাওয়া যায়, দোষারোপ করা যায় – কিন্তু সবচেয়ে উত্তম পন্থা হবে ভোটারদের কাছে ফিরে যাওয়া আর কীভাবে ভবিষ্যতে নিজের ভোট রক্ষা করা যায় সেই উপায় খুঁজে বের করা। পরীক্ষায় ফেল করার পর শিক্ষক বা পরীক্ষকের উপর দোষ চাপানোর চেষ্টা না করে নতুন করে পড়াশুনায় মন দেয়া সত্যিকারের বুদ্ধিমানের কাজ। অনেক আগে এক বন্ধুর লেখায় পড়েছিলাম তার এক শিক্ষকের উপদেশ। সেই বন্ধুর বোর্ডে প্রথম হবার সমস্ত সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু সমস্যা ছিল একটাই, তার সারনেম বা পদবী। ওকে শিক্ষক বলেছিলেন যদি দ্বিতীয় যে হবে তার চেয়ে অনেক বেশি নম্বর পাও কেবল তখনই তোমার প্রথম স্থান নিশ্চিত, অন্যথায় মানিপুলেট করবেই। তাই মাঠে নেমে যদি সত্যিকার জনসমর্থন আদায় করা যায় তবে জনতাই তাদের রায় বুক দিয়ে রক্ষা করবে। এটা বাংলাদেশের মানুষ বার বার করেছে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে জেতার জন্য বিদেশী শক্তির মুখাপেক্ষী হওয়া শুধু তাদের জন্য নয়, দেশের জন্যও বিপদজনক।

আমাদের দেশে সব দল নিজেদের ব্যর্থতার জন্য নিজেদের বাদ দিয়ে যে কাউকে দায়ী করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তারা নিজেরাই যে নিজেদের ব্যর্থতার মূলে রয়েছেন সেটা তারা ভাবতেই পারেন না। আর এর ফলে জনগণের মধ্যেও ভোটদানের ইচ্ছা কমে গেছে। কারণ তারা ধরেই নেয় ভোট দিক বা নাই দিক নিয়তির মত বিজয়ী আগে থেকেই ঠিক করা, না বিজয়ী না বিজিত কেউই তাদের ভোটের ক্ষমতা স্বীকার করবে না। একই অবস্থা সর্বত্র। খেলায় হারলে দোষ প্রতিপক্ষের অথবা আম্পায়ারদের। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থার জন্য দায়ী আওয়ামী লীগ, ভারত, আমেরিকা, চীন – এর পেছনে নিজেদের কোন দায়দায়িত্ব নেই। আমরা নিজেরাই যে বিভিন্ন ভাবে সমাজে এই মনোভাব গড়ে তুলতে সাহায্য করছি সেটা নিয়ে আমাদের মাথা ব্যাথা নেই। নিজেদের দুরাবস্থার জন্য কে দায়ী – সংখ্যালঘু, নাস্তিক, কমিউনিস্ট, ইহুদি নাসারা? কিন্তু কে ঘুষ খায়, কে দুর্নীতি করে, কে সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করে – তা নিয়ে আমাদের কথা নেই। একটু চিন্তা করলেই দেখব এর জন্য দায়ী সরকারি, বিরোধী নির্বিশেষে সমস্ত রাজনৈতিক দল। কারণ দেশের সার্বিক পরিস্থিতির জন্য শুধু সরকারি দল নয়, বিরোধী দলগুলোও সমান ভাবে দায়ী। যদি কোন পক্ষ তার দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে দেশে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। কিন্তু কোন পক্ষই এর দায়িত্ব নিতে চায় না। এই যে জবাবদিহিতা এড়িয়ে যাবার মনোভাব সেটাই সবচেয়ে ক্ষতিকর।

ভারতের নির্বাচনে আরও যে জিনিসটা ভালো লাগল তা হল বাম দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ, বিশেষ করে পশ্চিম বঙ্গে অনেক তরুণ কমরেডদের নির্বাচনে নামা। কোন আসন না পেলেও তারা সমানে সমানে লড়াই করেছে। সচেয়ে বড় কথা নির্বাচনের মাঠ থেকে পালিয়ে যায়নি। আমাদের দেশে বাম দলগুলো বিশেষ করে সিপিবি নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না আওয়াজ তুলে নির্বাচন বয়কট করে। কিন্তু একটি পুঁজিবাদী দলের কাছ থেকে নিরপেক্ষতার আশা করা কি এক ধরণের আত্মপ্রবঞ্চনা নয়? ভারতের বামরা হেরে গেলেও লড়াই করেই হারছে, ভোট চুরির অভিযোগ না করে পরবর্তী সময়ে আরও বেশি করে জনগণের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সচেষ্ট হবার কথা বলছে। অন্তত দীপ্সিতা ধরের নির্বাচন পরবর্তী ইন্টার্ভিউ দেখে সেটাই মনে হল। অথচ আমাদের দেশের বাম দলের প্রার্থীরা পরাজিত হয়ে প্রথমেই সরকারি দলকে দোষারোপ করে। আমি বলছি না যে সেটা করে তারা মিথ্যা কিছু বলছে। কিন্তু এই মনোভাব দায়িত্ব এড়িয়ে যাবার মনোভাব – এটা সাফল্যের জন্য সংগ্রাম নয়, ব্যর্থতাকে ঢাকার মনোভাব। অজুহাত খোঁজার মনোভাব। অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক দলের দুর্নাম নিয়েও কিন্তু বিজেপি সবার জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারছে। সব দল এতে অংশ নিচ্ছে। কেউ হারছে, কেউ জিতছে। তাহলে আমাদের দেশের সেক্যুলার দল কেন অন্তত ভারতের মত একটা নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে পারছে না?

কয়েক দিন আগে এক বন্ধুর সাথে বসে চা খাচ্ছিলাম মস্কোর এক ক্যাফেতে। আজকাল তেমন সময় করে উঠতে পারি না, তাই হঠাৎ দু এক ঘণ্টা ফ্রি পেলে চেষ্টা করি দেখা করতে। ও দেশে বাম রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল, এখনও একটি দলের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। গল্পের এক পর্যায়ে বলল
– দাদা, আমাদের দেশে আর মনে হয় সৎ ভাবে বেঁচে থাকার কোনই উপায় নেই।
– হঠাৎ এমন ভাবছেন?
– উন্নয়নের হাওয়া খুব কম লোকের গায়েই লাগছে, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ খুবই কষ্টে দিন চালাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা তাদের পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই।
– কিন্তু তারা তো সৎ পথেই চলছে। এই তো কয়েক দিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছেলের কথা পড়লাম। ঢাকায় এসে রিক্সা চালিয়ে নিজের ও বোনদের লেখাপড়ার খরচ চালায়। এরা তো সৎ।
– তবে তাদের প্রায়ই অসতের সাথে কম্প্রোমাইজ করতে হয়। ক’ দিন আগে দেশে ঘুরে এলাম। বন্ধুদের সাথে কথা হল। এক সময় একই সাথে রাস্তায় রাজনীতি করেছি। এখন বলল যে সবাই এখন চাঁদাবাজি করে। যদি সরকারি দল নেয় এক লাখ, এদের অঙ্গ সংগঠনগুলো কিছুটা কম, বিএনপি ১০ হাজার, আমরা পাই ১ হাজার বা পাঁচ শ। আর সবাই, সেটা ডান বলেন আর বাম বলেন, সরকারি দল বলেন আর বিরোধী দল বলেন – যে যার প্রাপ্য নিয়েই খুশি। সবাই চায় এই চাঁদা বা দুর্নীতিতে নিজের ভাগটা বাড়াতে, কিন্তু কেউই নিজের ভাগ যতই ছোট হোক সেটা হারাতে চায় না। এ জন্যে জনগণের পাশের দাঁড়ানোর আর কেউ নেই। জনগণ নিজেরা সৎ পথে উপার্জন করলেও বাধ্য হচ্ছে এসব অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করতে। আর জানেন তো অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে – তারা দুজনেই সমান দোষে দোষী। তাই তো বললাম আমাদের দেশে সৎ ভাবে চলা দিন দিন অসম্ভব হয়ে উঠছে।

আমি কখনোই বাম দলগুলোকে এই মুহূর্তে ক্ষমতার দাবীদার মনে করিনি। তবে সব সময়ই মনে করতাম এরা দেশের রাজনৈতিক জীবনে, রাজনীতিকে সুস্থ্য রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে রাজনীতির মুলাধারা থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখে এরা প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিকেই সামনে আসার পথ করে দিচ্ছে। ক্ষমতা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে বড় পুরস্কার, কিন্তু রাজনতিক পরিবেশ সুস্থ্য রাখাও যেকোনো রাজনৈতিক দলের অন্যতম প্রধান দায়িত্বের একটি। সরকার বা প্রশাসন মাঠ পরিস্কার করবে আর আমরা এসে খেলব – সেই মনোভাব অন্তত যেসব দল সমাজ বদলাতে চায় তাদের কাছে কাম্য নয়। ভারতের বাম দলগুলোর কাছ থেকে আমাদের বামেরা অন্তত এই শিক্ষাটি নিতেই পারে।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো