বিজ্ঞান প্রযুক্তি

বিজ্ঞান ভাবনা (১০৪): পারমাণবিক যুদ্ধ – পক্ষে বিপক্ষে  

– বিজন সাহা  

বিজন সাহা (ফাইল ছবি)

এর আগে আমরা পারমাণবিক যুদ্ধ আসন্ন কিনা সে নিয়ে লিখেছিলাম। সেখানে ছিল মূলত সেরগেই কারগানভের তত্ত্ব। যেহেতু পশ্চিমা বিশ্ব একের পর এক রেড লাইন ক্রস করে যাচ্ছে তাই তাঁর ধারণা এক সময় বৃহৎ দুর্ঘটনা এড়াতে রাশিয়াকে পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে হলে হতেও পারে। এর পর থেকেই এদেশে এর পক্ষে ও বিপক্ষে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়েছেন। এর পক্ষে মত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিষয়ে খ্যাতনামা বিশেষজ্ঞ দ্মিত্রি ত্রেনিন। কারাগানভের মত তিনিও মনে করেন আমেরিকা ইউক্রেন বা অন্য কারও হাত দিয়ে রাশিয়াকে পরাজিত করার স্বপ্নে এতটাই বিভোর যে কিছুতেই এর পরিণাম নিয়ে ভাবছে না। আর এর প্রধান কারণ আমেরিকা নিজের জন্য কোন সীমানা নির্ধারণ করেনি। এটা অনেকটা আমেরিকান ড্রিমের মত – যার সীমা শুধুই আকাশ যার আরেক অর্থ চাওয়ার কোন সীমা নেই। আর যখনই কেউ সীমাজ্ঞান হারিয়ে ফেলে তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। যে লোক কত পেগ গিলতে পারবে সেটা সম্পর্কে সচেতন সে সাধারণত মাতাল হয় না, তার আগেই পানে ক্ষান্ত দেয়। কিন্তু যে সেটা জানে না, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সে মাতাল হয়ে গড়াগড়ি দেয়। দ্মিত্রি ত্রেনিনের মতে কি অর্থনৈতিক, কি রাজনৈতিক, কি ভৌগলিক কোন ক্ষেত্রেই নিজের জন্য কোন সীমারেখা না টানার কারণে আমেরিকা দুর্বল দেশের উপর ছড়ি ঘোরাতে পারলেও শক্তিশালী দেশকে প্রভোক করতে পারে আঘাত হানার জন্য। আর সেই দেশ যদি পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হয় সেটা শুধু দুই দেশ নয়, মানব সভ্যতার জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। আসলে নিজের ইচ্ছা বা অধিকারে সীমা না টানলে সেটা মানুষকে দায়িত্বহীন করে। আমেরিকার মত একটা দেশ যদি তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগলিক স্ট্র্যাটেজিতে দায়িত্বহীনতার পরিচয় দেয় সেটা বিশ্বের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। সেরগেই কারাগানভের মত তাই তিনিও মনে করেন এভাবে চলতে থাকলে পারমাণবিক যুদ্ধের কোন বিকল্প থাকবে না আর আমেরিকার সাথে অলআউট যুদ্ধ এড়াতে ইউরোপে কোথাও পারমাণবিক হামলা করলে করতে হতেও পারে। কোন সেই দেশ? যেহেতু ইউক্রেনের যুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অগ্রনী ভূমিকা পালন করছে তাই সেটা হতে পারে ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড, জার্মানিবাবেলজিয়াম। তবে যেহেতু ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড নিজেরাই পারমাণবিক অস্ত্রধারী, তাই এদের আঘাত না করাই ভালো।উভয়েরবিশ্বাসপোজনানকেবাঁচাতেআমেরিকাকখনইবোস্টনকেস্যাক্রিফাইসকরবেনা।দ্মিত্রিত্রেনিনেরএইঅবস্থাননিঃসন্দেহেকারাগানভেরতত্ত্বেরসমর্থনেবিরাটপদক্ষেপ।

কিন্তু সবাই কি এটা ভাবছে? ভিচিস্লাভ নিকোনভ সেটা মনে করেন না। তার ধারণা পারমাণবিক যুদ্ধ ছাড়াই ইউক্রেন সমস্যার সমাধান করা যাবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে যত কম কথা বলা যায় ততই ভালো। একই মত পোষণ করেন আলেক্সান্দর দুগিন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে পশ্চিমা বিশ্বে আলেক্সান্দর দুগিনকে পুতিনের আদর্শিক গুরু বলে ধরা হয়, মনে করা হয় পুতিনের বর্তমান কাজকর্মের অনেক কিছুই দুগিনের ধারণার প্রতিফলন। তিনি কখনই রাশিয়ার ইউরোপের দিকে ঝুঁকে পড়ায় বিশ্বাসী ছিলেন না, তাঁর মতে রাশিয়া ইউরোপ ও এশিয়ার সংমিশ্রনে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সভ্যতা আর এটা মাথায় রেখেই তাকে নিজের স্বতন্ত্র পথে চলতে হবে। তাছাড়া পারমাণবিক যুদ্ধ মানে ধ্বংস। রাশিয়া সব সময় সৃষ্টির কথা বলেছে। যদি অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের উপনিবেশগুলকে দুর্বল করে নিজেদের আর্থসামাজিক ভাবে শক্তিশালী করেছে, রাশিয়া সব সময়ই উল্টো তার উপনিবেশগুলো গড়ে তুলেছে। কী জারের রাশিয়া, কী সোভিয়েত আমল – মস্কো সব সময়ই সমস্ত জায়গায় সৃষ্টির বাণী নিয়ে গেছে। বলতে গেলে মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা থেকে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে মধ্য এশিয়ার রিপাবলিকগুলোকে। ইউক্রেন, বাল্টিকের দেশগুলোর শিল্প গড়ে উঠেছিল সোভিয়েত আমলেই। তাই রাশিয়ায় জন্য পারমাণবিক যুদ্ধ মানে নিজেকে পশ্চিমা বিশ্বের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। এটা আমাদের আদর্শ, আমাদের মানসিকতার বিপরীত। তাই সর্ব শক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে হবে পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানোর জন্য। রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানীওনাট্যকারসেরগেইকুরগিনিয়ানওমনেকরেনযেকোনোমুল্যেইহোকনাকেনপারমানবিকযুদ্ধএড়িয়েযাওয়াউচিৎ।

তবে এই বিতর্ক মূলত একাডেমিক পর্যায়ে – অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক ভাষ্যকার – এদের মধ্যে। কিন্তু কী ভাবছে এদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব? কিছুদিন আগে পিটারবারগ অর্থনৈতিক ফোরামে ভ্লাদিমির পুতিনকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন পশ্চিমা বিশ্ব পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন স্পেকুলেটিভ কথাবার্তা বলে এই অস্ত্র ব্যবহারের বার নীচে নামিয়ে দিচ্ছে। এটা ঠিক পারমাণবিক অস্ত্র যেহেতু আছে তাই সেটা ব্যবহার করা যেতেই পারে। ব্যবহার করার জন্যই অস্ত্র তৈরি করা হয়। তবে বর্তমানে এর মূল ভূমিকা হচ্ছে যুদ্ধের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করা। কিন্তু তাদের মনে রাখা দরকার রাশিয়ার অস্ত্রের পরিমাণ ন্যাটোর চেয়ে অনেক বেশি, রাশিয়া যেকোনো চ্যালেঞ্জ গ্রহণ ও তার মোকাবেলা করতে প্রস্তুত। ফলে এখন ঐ পক্ষ থেকে প্রস্তাব আসছে পারমাণবিক অস্ত্রের পরিমাণ সীমিত করার জন্য। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। কারণ এটা আমাদের কমপিটেটিভ এডভান্টেজ বা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা। এ থেকে বোঝা যায় যে পারমানবিক অস্ত্র এখনও অনেকদিন পর্যন্ত শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। শুধু তাই নয় রাশিয়া তার পারমাণবিক আর্সেনাল বাড়াচ্ছে। গত সপ্তাহে সবেমাত্র পাশ করা অফিসারদের সাথে সাক্ষাতের সময় ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন ইতিমধ্যে কসমিক ফোর্স ও নেভি সিরকন, পসেদন, সারমাত সহ অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত করা হয়েছে। এ বছরের শেষে আরও নতুন সাবমেরিন আসবে। এসব থেকে প্রমানিত হয় যেহেতু পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়াকে কনভেনশনাল যুদ্ধে পরাজিত না করলেও অস্ত্রের দুর্ভিক্ষে ফেলতে চাইছে সেই ক্ষতি পূরণের জন্য সে পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডার বাড়াচ্ছে। কারণ একমাত্র পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়ই আমেরিকাকে লাগাম টানতে বাধ্য করতে পারে। কেননা কনভেনশনাল যুদ্ধ হবে ইউরোপের মাটিতে, আমেরিকা অনেক দূরে। এতে আর যাই হোক আমারিকানদের রক্ত ঝরবে না, উল্টো অস্ত্র বিক্রি করে তার অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। কিন্তু পারমাণবিক যুদ্ধ হলে আমেরিকা আঘাত এড়াতে পারবে না। আর একমাত্র নিজ ভূখণ্ডে যুদ্ধের ভয়ই আমেরিকাকে তার আকাঙ্খার পথে কাঁটা ফেলতে বাধ্য করতে পারে, তাকে বাধ্য করতে পারে অন্যের অধিকার স্বীকার করতে, মেনেনিতে।যতদিনসেটানাহচ্ছেততদিনযুদ্ধেরভয়থাকবেই।

পশ্চিমা বিশ্ব অস্বীকার করলেও ইউক্রেনের প্রতি তাদের অন্ধ সমর্থন যুদ্ধকে শুধু দীর্ঘই করছে না ভয়ঙ্কর রূপও দিচ্ছে। তবে সেটাকে অন্ধ সমর্থন না বলে সুচিন্তিত সমর্থন বলাই ভালো আর ইউক্রেনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই সমর্থন পেয়ে অন্ধের মত তাদের দেখানো পথে হাঁটছে। কি সেই পথ? যত বেশি সম্ভব রুশ হত্যা করা। কিন্তু তারা নিজেরা ভুলে যাচ্ছে রুশদের হত্যা করে তারা আসলে নিজেদেরই দুর্বল করছে। এটা অনেকটা সংখ্যালঘুদের দেশ থেকে তাড়িয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ তথা একাত্তরের চেতনাকে দুর্বল করার মত। কারণ যাদের মদদে এসব করা হচ্ছে তারা কখনই স্লাভিয়ানদের বন্ধু ছিল না, আর ইউক্রেনরা নিজেদের রুশ বলে স্বীকার না করলেও তারা যে স্লাভিয়ান সেটা অস্বীকার করতে পারবে না। ভাগনার নিয়ে দু দিন ব্যস্ত থাকলেও জাপারোঝিয়া ইস্যু আবার সামনে চলে এসেছে। এর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত আমেরিকান রকেটের সাহায্যে ব্যবহৃত পারমানবিক জ্বালানীর থেকে মাত্র দশ মিটার দূরে আঘাত হেনেছে ইউক্রেন। এটা প্রতীকী। প্রয়োজনে তারা সেখানে আঘাত হানতে দ্বিধা করবে না, কারণ তারা জানে পশ্চিমা বিশ্ব এটাকে রাশিয়ার কাজ বলে প্রচার করবে। ইউক্রেন সর্বশক্তি নিয়োগ করে ন্যাটোকে যুদ্ধে নামানোর চেষ্টা করছে, করবে। তখন? মুখে যতই মানবতার কথা বলুক না কেন সমলিঙ্গের বিয়ে, বাচ্চাদের ইচ্ছেমত লিঙ্গ গ্রহণের অধিকার এসব আর যাই হোক মানবতার পক্ষে যায় না, প্রকৃতির সুষ্ঠু বিকাশে বাঁধার সৃষ্টি করে। এক দিকে প্রকৃতি সংরক্ষণের কথা বলব, অন্যদিকে প্রকৃতির নিয়মের বিরোধিতা করব সেটা তো হয় না। পশ্চিমা বিশ্বের গত দেড় বছরের চালচলন আসলে তাদের উন্মাদনার বহিঃপ্রকাশ। নিজেদের অর্থনীতি যখন ধ্বংসের পথে তখনও তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটার পর একটা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেই যাচ্ছে, নিজ দেশের জনগণের চরম দুর্গতি উপেক্ষা করে ইউক্রেনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছে। তাই এরা যে শেষ পর্যন্ত রাশিয়াকে বাধ্য করবে না পারমাণবিক যুদ্ধে নামতে সেই গ্যারান্টিই বা কে দেয়। তাই শেষ পর্যন্ত রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে কিনা সেটা যতটা না রাশিয়ার নিজের উপর নির্ভর করছে তার চেয়ে বেশি করে নির্ভর করছে পশ্চিমা শক্তির উপর। তাছাড়া এফ-১৬ বিমান পারমাণবিক অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। কিছু কিছু সিনেটর ইউক্রেনকে পারমাণবিক অস্ত্র দেবার পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। তাই রাশিয়া যদি এমতাবস্থায় শুধু সন্দেহ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয় তখন? ওয়াশিংটনে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আন্তনভ বলেছেন আমেরিকা রাশিয়াকে কৌশলগত ভাবে পরাজিত করার স্বপ্নে বিভোর যার পরিণাম অপ্রত্যাশিত হতে পারে। লাভরভ ইতিমধ্যেই বলেছেন এফ-১৬ কি অস্ত্র বহন করবে সেটা তারা জানে না, তাই সেক্ষেত্রে তারা নিজেদের মত করে এর উত্তর দেবে। পুতিন বলেছেন লেপার্ড ট্যাঙ্কের মত এফ-১৬ বিমানও জ্বলবে। তবে রাশিয়া দেখবে সেটা কোথায় করবে। এর অর্থ এরা এমনকি ন্যাটো ভুক্ত দেশে আঘাত করার পথ খোলা রাখছে, বিশেষ করে সেসব বিমান যদি ন্যাটোর কোন দেশকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। আর ন্যাটোর দেশে আঘাত করা মানেই নিজেদের স্ট্র্যাটেজিক নিউক্লিয়ার ওয়ারের জন্য প্রস্তুত রাখা। ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধকে রুশ সেনাদের জন্য অমূল্য অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্র বলে আখ্যায়িত করেছেন। এটা মনে হয় ন্যাটোর সাথে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের কথা মাথায় রেখেই বলা। এছাড়া তিনি ন্যাটোর সেনাদের ভাড়াটে সৈন্যের বেশে ইউক্রেনে সরাসরি যুদ্ধ করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তলোয়ার একবার খাপ থেকে বের করলে সেটা উল্টো খাপে ভরার চেয়ে তা দিয়ে আঘাত হানার সম্ভাবনাই বেশি। বর্তমানে অবস্থা যেখানে দাঁড়িয়েছে তাতে দিন দিন পশ্চিমা বিশ্বের সাথে রাশিয়ার যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়ছে।

সম্প্রতি দ্মিত্রি সাইমসের সাথে এক সাক্ষাৎকারে সেরগেই লাভরভ বলেছেন যে পশ্চিমা বিশ্বের নেতাদের মাথায় এক বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছে যে রাশিয়াকে স্ট্র্যাটেজিক্যালি পরাজিত করা সম্ভব, শুধু দরকার আরেকটু জোরে চেপে ধরা। এর আগে নেপোলিয়ন, হিটলার সমস্ত ইউরোপকে সাথে নিয়ে রাশিয়া আক্রমণ করেছে আর প্রতিবারই পশ্চিমা বিশ্বের কোন রাজধানীতে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। তারা যদি নিজেদের ইতিহাস জানত এভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নামত না। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় প্রিগঝিনের বিদ্রোহ দমন করা হল, অথচ ফ্রান্সে বিভিন্ন গণবিক্ষোভ বা আমেরিকায় বিএলএম মুভমেন্টে অনেক বেশি রক্তক্ষয় হয়েছে, অনেক দীর্ঘ সময় এই আন্দোলন চলছে, চলেছে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব আমাদের প্রায় বিনা রক্তপাতে বিদ্রোহ দমনকে দুর্বলতা মনে করে। বলছে ইউক্রেনকে যুদ্ধের সরঞ্জাম সরবরাহ করা সঠিক ছিল। শুধু সেটাই নয় – তারা এখন আর ইউক্রেনের জন্য নয়, পশ্চিমা বিশ্বের জয়ের কথা বলছে। তারা যে যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত প্রকারান্তরে সেটাই স্বীকার করছে। আমরা সেটা আগেই জানতাম। চেষ্টা করে দেখতে পারে। আমরা প্রস্তুত যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবেলা করার জন্য। যদিও আমরা আলচনার জন্য প্রস্তুত, তবে এটা বুঝি যে আলোচনা মানে সময় নেয়া, ইউক্রেনকে নতুন করে যুদ্ধ সাজে সজ্জিত করে আবার যুদ্ধে নামানো। তাই আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে আমরা এ ধরণের আলোচনা বা শান্তি চুক্তি চাই কি না।

সাইমসের সাথে সাক্ষাৎকারে সেরগেই কারাগানভ বলেন যে তিনি জানেন প্রিভেন্টিভ নিউক্লিয়ার আঘাত করার সিদ্ধান্ত নেয়া কতটুকু কষ্টকর। তবে তিনি প্রায় তিন বছর ভেবেছেন এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বড় যুদ্ধ থামাতে এরকম আঘাত অপরিহার্য। সোভিয়েত আমলে দুই পক্ষের মধ্যেই ভয় ছিল – ছিল পারমাণবিক যুদ্ধ এড়ানোর চেষ্টা। এখন সেই ভয় নেই। দীর্ঘ দিন সুখে থেকে পশ্চিমা বিশ্বের এলিট শ্রেণী ভয় ভুলে গেছে, ভুলে গেছে পারমাণবিক যুদ্ধের ভয়াবহতা। যদি আমেরিকার নেতৃত্ব বিশ্বাস করত যে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, আজ তাদের বদ্ধমূল ধারণা যে রাশিয়া সেটা কোন অবস্থাতেই করবে না। ফলে একের পর এক চেষ্টা করে যাচ্ছে রাশিয়াকে প্রভোক করতে। আর এ জন্যেই এই ডক্ট্রিন। না, পুতিন বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটা বলার দরকার নেই, তবে সমাজে এই আলোচনা থাকা উচিৎ। সমাজের বোঝা উচিৎ এই যুদ্ধের ভয়াবহতা। একমাত্র তখনই বিভিন্ন দেশের সরকার কোন পদক্ষেপ নেবার আগে সব বিষয় গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখবে। আমি চাই না যে কোন দেশ পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করুক। তবে সমাজে, একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এই আলোচনা থাকা উচিৎ। আমার বিশ্বাস আমার পক্ষে সম্ভব হয়েছে সেই আলোচনা শুরু করা।

পশ্চিমা বিশ্বের কথা বলতে পারব না, তবে এখানে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের বিশ্বাস যে ইউক্রেন যুদ্ধ এটা রিহার্সাল – আসল যুদ্ধ সামনে, ন্যাটোর সাথে। ইউক্রেনে দু পক্ষই একে অন্যের সবলতা আর দুর্বলতা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিচ্ছে। এমনকি এখন যদি শান্তি চুক্তি হয়ও সেটা হবে কয়েক বছরের মধ্যে নতুন করে ব্যাপক স্কেলে যুদ্ধ শুরু করার জন্য। আর সেই যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা ছাড়া উপায় থাকবে না।  তাই সব কিছুই করতে হবে ভবিষ্যৎ সর্বগ্রাসী যুদ্ধকে মাথায় রেখে। বর্তমানে ইউরোপ আমেরিকার পদানত। সেই যুদ্ধ হবে ইউরোপকে আমেরিকার কবল থেকে মুক্ত করার জন্য। তবে সেই যুদ্ধ শুরু হবে ঐ পক্ষ থেকে রাশিয়া ধ্বংসের মন্ত্র নিয়ে। আর এ জন্যেই রাশিয়া সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে, আধুনিক করছে। তার সামনে কোন পথ খোলা নেই বিজয় ছাড়া। হয় আমেরিকা ইউরোপ থেকে সামরিক ঘাঁটি সরিয়ে নেবে নয়তো সবাইকে নিয়ে হারিয়ে যাবে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে। এটা খুবই কঠিন চয়েজ – কিন্তু ওরা রাশিয়ার জন্য অন্য কোন পথ খোলা রাখছে না।

এই আলোচনার পরে আমারিকার একটি সংস্থা পারমাণবিক যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে কিছু তথ্য প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা গেছে সেই যুদ্ধে আমেরিকার ৯৯%, রাশিয়ার ৯৮%, ইউরোপের ৯৯% ও চীনের ৯৯% মানুষ নিহত হবে। সেটা অবশ্য এক দিনে নয়, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে। বিশ্বের প্রায় ৮০% মানুষ মারা যাবে। এটা হয়তো পশ্চিমা বিশ্বের মোড়লদের গোল্ডেন বিলিয়ন সূত্রকে বাস্তবে রূপ দেবে, কিন্তু তারা কি এই বিলিয়ন চান সেটাও ভাবার বিষয়।কারাগানভের বিশ্বাস এই মুহূর্তে রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ও গুণগত  মানের দিক থেকে ৫-৭ বছর এগিয়ে আছে। এই সময়টাকে ব্যবহার করতে হবে। কেননা একবার আমেরিকা রাশিয়ার সমকক্ষ হলে পারমাণবিক বিশ্ব যুদ্ধ এড়ানো যাবে না। রাজাকে বাঁচাতে দু একটা সেনা স্যাক্রিফাইস করার প্রথা দাবা খেলায় আছে। বিশ্ব রাজনীতি এটাও একটা বিশাল দাবার বোর্ড।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো