বিজ্ঞান প্রযুক্তি

বিজ্ঞান ভাবনা (১০৩): ভাগনার বিদ্রোহ – এর পর কি?

-বিজন সাহা

বিজন সাহা (ফাইল ছবি)

যদিও ভাগনারের বিদ্রোহ আপাতত দমন করা হয়েছে তবে সেটা নিয়ে উত্তরের চেয়ে প্রশ্নই বেশি। সোমবার রাতে ভ্লাদিমির পুতিন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, বলেছেন জাতীয় ঐক্যের ফলেই সম্ভব হয়েছে এত দ্রুত ও প্রায় বিনা রক্তক্ষয়ে বিদ্রোহ দমন করা। প্রথম থেকেই আদেশ ছিল রক্তপাত এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করা, যদিও সেটা সম্ভব হয়নি। বিদ্রোহীদের হাতে দশ জনের বেশি রুশ সৈন্য মারা গেছে, নষ্ট হয়েছে তিনটি কে-৮ আলিগেটর হেলিকপ্টার, একটা ইল-২২ বিমান। এদের অনেকেই অবশ্য এই বিদ্রোহ দমনে অংশ নেয়নি। ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন ভাগনারের সেনারা আর্মির সাথে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, রক্ত দিয়ে তারা দেশপ্রেমের প্রমাণ দিয়েছে। কিন্তু কারো কারো ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষের শিকার হয়ে ভুল পথে গিয়েছে। তাই প্রয়োজন ছিল যথা সম্ভব চেষ্টা করা রক্তপাত এড়ানো। সেটা সম্ভব হয়েছে। এখন এদের মধ্যে যারা চায় তারা সেনাবিহিনীতে যোগ দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে, না চাইলে বাড়ি ফিরে যেতে পারে অথবা বেলারুশ চলে যেতে পারে। তিনি কথা দিয়েছেন। সেটা রক্ষা করবেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে পুতিন যখনই কাউকে কোন কথা দেন সেটা রক্ষা করেন। এ নিয়ে সমাজে অসন্তোষ আছে, তিনি জানেন। কিন্তু মনে করেন কথা দিয়ে কথা না রাখা অপরাধ।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে ভাগনার গ্রুপে সদস্য সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার হলেও মাত্র আট হাজার সেনা এতে অংশ নেয়, অধিকাংশই এতে অংশ নিতে অস্বীকার করে। যারা অস্বীকার করে তারা বলেছে, তারা চুক্তিবদ্ধ ইউক্রেন ও ন্যাটোর সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও করার জন্য, তারা ভ্রাত্রিঘাতী যুদ্ধে অংশ নেবে না। যেসব সেনারা রোস্তভ পর্যন্ত এসেছিল তাদের অনেকেই পুতিনের বক্তব্যের পরে ভিন্ন ভাবে ভাবতে শুরু করে। মনে রাখতে হবে যে প্রিগঝিনকে সবাই পুতিনের কাছের লোক বলেই মনে করত আর সে কারণেই তার উপর আস্থা রাখত। এতদিন পর্যন্ত সেটাই ছিল। এমনকি প্রিগঝিন যখন রোস্তভ অভিমুখে যাত্রা করে তার দাবি ছিল শইগু ও গেরাসিমভের পদত্যাগ। এর আগেও তাদের মধ্যে মনোমালিন্য ছিল, বিশেষ করে আমুনেশন সাপ্লাই নিয়ে টেলিগ্রাম চ্যানেলে অনেক বাকবিতণ্ডা হয়েছে বা বলা চলে প্রিগঝিন এক তরফা অভিযোগ করে। যদিও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সব সময়ই বলেছে তারা সব সেনাদের মধ্যে সমান ভাবে অস্ত্র ও গোলাবারুদ বন্টন করেছে। তবে প্রিগঝিন ভাগনারকে নিয়ে যেহেতু সেনাবাহিনীর অধীনে যুদ্ধ করতে চায়নি, তার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে ইচ্ছে করে তাকে গোলাবারুদ দেয়া হচ্ছে না। কিন্তু যখনই ভ্লাদিমির পুতিন জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন ও বিদ্রোহীদের দেশদ্রোহী বলে অভিযুক্ত করেন, অনেকেই বুঝতে পারে যে প্রিগঝিনের লড়াই আর শইগুর বিরুদ্ধে থাকছে না, প্রেসিডেন্ট তথা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হচ্ছে। গতকাল পুতিন সেনাবাহিনীর অফিসারদের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে গত দেড় বছরে ভাগনার গ্রুপকে ৮৬ বিলিয়ন রুবল দেয়া হয়েছে যার প্রায় ৭০ বিলিয়ন বেতন। এছাড়াও ইনস্যুরেন্স বাবদ দেয়া হয়েছে ১১০ বিলিয়ন রুবল। আর এই সেনাদের জন্য অস্ত্রশস্ত্র, পোশাক এসব সাপ্লাইয়ের জন্য প্রিগঝিনের ব্যবসায়িক কোম্পানি পেয়েছে ৮০ বিলিয়ন রুবল। তিনি নির্দেশ দিয়েছে এর হিসাবপত্র অডিট করার জন্য। অনেকের ধারণা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে বিভিন্ন বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার কারণে প্রিগঝিন আগে যে ব্যবসায়িক সুবিধা পেত সেটা বন্ধ হয়ে যায়। হয়তো সেটাও তাকে এ ধরণের পদক্ষেপের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দুগিন, সলভিয়েভ সহ অনেকেই যারা প্রিগঝিনের সাথে আগে পরিচিত ছিলেন তারা কেউই তার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন করেননি। তবে এই ঘটনার পরে তারা তাকে আর বিশ্বাস করে না। কেন আগে বুঝতে পারল না সে প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন একজন লোক যখন সুপার মার্কেটে নিরীহ মানুষের উপর গুলি চালায় তাকে কি আগে কেউ সন্দেহ করে? তাদের অনেকের ধারণা এটা ছিল প্রিগঝিনের স্বতঃস্ফূর্ত সিদ্ধান্ত। তবে যেহেতু আমেরিকা আগে থেকে এটা জানত বলে দাবি করেছে তাই সেটা পরিকল্পিত কিনা সেই প্রশ্নও আসছে। আখমাত গ্রুপ প্রধান আলতি আলাউদিনভ, যিনি বিদ্রোহ দমনে লুগানস্ক থেকে সেনা নিয়ে রোস্তভ আসেন, বলেন সেনাদের নিয়ে আসতে তার অর্ধেক দিন লেগেছে। তাই প্রিগঝিন আগে থেকে পরিকল্পনা না করলে এত দ্রুত এখানে আসতে পারত না।

ফেসবুকে অনেকেই দেখলাম লিখেছে পুতিনের উচিৎ ছিল কঠোর হস্তে বিদ্রোহ দমন করা। অনেকে বলেছে সেটা না করে লৌহমানব পুতিন নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। এসব দেশ থেকে লেখা। কিন্তু রাশিয়ায় তাঁকে কেউ লৌহমানব বলে আখ্যায়িত করে বলে জানা নেই। অনেকের ধারণা তিনি যথেষ্ট নরম, সব সময় কম্প্রোমাইজ খোঁজার চেষ্টা করেন, চরম পন্থা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন। যখন একেবারেই উপায় থাকে না তখন শক্ত পদক্ষেপ নেন – যেমন ইউক্রেনে এই স্পেশাল অপারেশন। এর আগে পশ্চিমা বিশ্ব বা ইউক্রেন চুক্তি মানবে না জেনেও মিনস্ক চুক্তি করেছেন, ইস্তাম্বুল চুক্তি করেছেন, করেছেন শস্য চুক্তি। এ নিয়ে সমালোচনা আছে। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেন কনফ্লিক্ট এড়িয়ে সমঝোতার মাধ্যমে কাজ আদায় করে নিয়ে। এটা ঠিক যে এই বক্তব্যে তিনি বলেছেন রক্তক্ষয় এড়াতে বললেও আর্মি যেকোনো পরিস্থিত জন্য প্রস্তুত ছিল, প্রয়োজনে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হত, কোন মতেই তাদের মস্কো আক্রমণ করতে দেওয়া হত না। এখানে মনে হয় কাজ করেছে ইউক্রেন ও বেলারুশের অভিজ্ঞতা। ইনুকোভিচ পশ্চিমা বিশ্ব কি বলবে সেটা ভেবে বেরকুট নামক স্পেশাল বাহিনীর উপর আক্রমণের পরেও হাত গুটিয়ে বসে ছিলেন। তার ফলাফল ইউক্রেন আজ ধ্বংসপ্রায়। অন্যদিকে লুকাশেঙ্কো শক্ত পদক্ষেপ নিয়ে এখনও ক্ষমতায়, বেলারুশের জনগণকে গৃহযুদ্ধের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন তিনি। অস্ত্র তৈরি করা হয় ব্যবহার  করার জন্য। যদি প্রয়োজনের সময় সরকার সেটা ব্যবহার করতে না পারে তাহলে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হয়। অনেকের ধারণা ১৯৯১ সালে বেলভেশস্কায়া পুশায় গরবাচেভ যদি ইয়েলৎসিন, ক্রাভচুক আর শুচকিয়েভিচকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিতেন তাহলে সোভিয়েত ইউনিয়ন বেঘোরে প্রাণ হারাত না। রাষ্ট্রের ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষার জন্যই সেনা বাহিনী, যদি সেই বাহিনী ব্যবহার করার মনোবল, শক্তি, সাহস না থাকে তাহলে রাষ্ট্র আর রাষ্ট্র থাকে না। একটা কথা মনে রাখতে হবে যে একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রধান কর্তব্য দেশের জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। যারা ভাগনারে যুদ্ধ করছে তারাও এ দেশের মানুষ,  সেনাবাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের স্বার্থে যুদ্ধ করেছে, যুদ্ধ করেছে বীরের মত, জীবন বাজি রেখে। তাই তাদের সুযোগ দেয়া উচিৎ। তাছাড়া তাদের কঠোর হস্তে দমন করতে গেলে সেটা যুদ্ধে পরিণত হত। দুই পক্ষের লোকজন মারা যেত আর মারা যেত প্রচুর সাধারণ মানুষ। শক্ত হাতে দমন করে ভাগনার গ্রুপ নিশ্চিহ্ন করা যেত, কিন্তু এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্র সম্পর্কে যে অবিশ্বাস তৈরি হত সেটা কাটাতে প্রচুর সময় লাগত। চেচিনিয়ার যুদ্ধের সময় পুতিন সাহস দেখিয়েছিলেন, দেখিয়েছিলেন যে তিনি জনগণের সাথে, জনগণকে নিয়ে যেকোনো বিদ্রোহ দমন করতে চান। প্রায় পঁচিশ বছর পরে তিনি আবারও সেটাই প্রমাণ করলেন। তাই যারা ভাবছেন এতে তার লৌহমানব ইমেজ নষ্ট হল, তারা ভুল বলছেন, তিনি কখনই নিজেকে সেভাবে উপস্থাপন করেননি, করতে চাননি। কেউ কেউ মনে করেন কেন প্রিগঝিককে নিউট্রাল করা হল না। মনে রাখা দরকার সব কিছুর পরেও ভাগনার একটা সামরিক গ্রুপ। সেখানে কম্যান্ডারের গুরুত্ব অনেক, সেখানে তিনিই সর্বেসর্বা। তাই প্রিগঝিনকে নিউট্রাল করলে ৮ হাজার সশস্ত্র মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করত কে? তাই যুদ্ধ এড়ানো যখন প্রাইওরিটি তখন কমান্ডারকে নিউট্রাল করার চিন্তা মাথায় না আনাই ভালো।

আরও যে প্রশ্নগুলো সামনে চলে আসে তাহল প্রিগঝিন কি একাই এটা করেছে নাকি তার পেছনে কেউ ছিল? মাত্র কয়েকদিন আগে রুশ গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবে মস্কো সহ বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু ষড়যন্ত্রকারীদের গ্রেফতার করেছে। রাশিয়ায় এই পঞ্চম বাহিনীকে অনেকে মনে করে প্রধান শত্রু, কেননা এদেশে সব বিপদ এসেছে ঘরের শত্রুদের কাছ থেকে। কোন কোন বিশেষজ্ঞদের ধারণা এদের সাথে প্রিগঝিনের যোগসাজশ ছিল আর যদি নাও থাকে এরা প্রিগঝিনের পক্ষে এই মুহূর্তে কাজ করতে পারত, যেমন প্রিগঝিনকে সমর্থন জানিয়েছে খাদারকভস্কি।

পশ্চিমা বিভিন্ন মাধ্যম জানিয়েছে যে আমেরিকা বা সিআইএ বেশ আগে থেকেই প্রিগঝিনের ক্যুর কথা জানত, তবে রাশিয়াকে জানায়নি। তাদের ভাষ্য এটা করেনি যাতে রাশিয়া আমেরিকাকে সন্দেহ না করে। তবে এখানে সবার ধারণা আমেরিকা শুধু জানত না, চাইত এটা হোক, তাই ভাগনারের বিরুদ্ধে কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা থাকলেও সেটা শেষ মুহূর্তে গ্রহণ করেনি। অনেকের বিশ্বাস ভাগনার যদি কয়েকটা দিন তাদের বিদ্রোহ টিকিয়ে রাখতে পারত, বাইরে থেকে অনেকেই তাদের সমর্থন করত, এমনকি দেশের ভেতরে পঞ্চম বাহিনীও আরও তৎপর হয়ে উঠত। অন্যদিকে রক্তপাত হলেও কিছু লোক ভাগনারের প্রতি সহানুভূতিশীল হত। তাই বিভিন্ন  সমাধানের এটাই ছিল উত্তম, যদিও পারফেক্ট নয়। এখন দেখার বিষয় পুতিন ভেতরের পঞ্চম বাহিনীকে কিভাবে ট্যাকল করেন। তিনি আগেই মতই নরম থাকবেন নাকি শক্ত হাতে এসব দমন করবেন? অনেকের বিশ্বাস এ ধরণের কাজে নেমে প্রিগঝিন নিশ্চয়ই সেনাবাহিনীর কারো কারো সাথে যোগাযোগ করেছিল। কারণ সব জায়গায় তার ছিল অবাধ চলাফেরা। তাই এখন প্রয়োজন সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের ভেতরে তার সম্ভাব্য সহযোগী ছিল কিনা সেটা বের করা আর পেলে তাদের উপযুক্ত সাঁজা দেয়া।

যেকোনো ধরণের সমঝোতায় আসা মানেই কিছু দেয়ার, কিছু নেয়ার প্রশ্ন। লুকাশাঙ্কো ঠিক কি বা কোন কোন বিষয়ে চুক্তি করেছেন প্রিগঝিনের সাথে এটা এখনও জনগণের জন্য প্রকাশ করা হয়নি, হয়তো হবেও না। এটা নিয়েও কৌতূহল থাকবে। ভাড়াটে সেনাদল নিয়ে এদের এখনও কোন আইন নেই, সেই অর্থে ভাগনার ছিল বেআইনি। এখন এ ব্যাপারেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অনেকের বিশ্বাস এই বিদ্রোহ কিছুটা হলেও সমাজ ও প্রশাসনকে নাড়া দেবে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে তারা সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে। দেশের ভিতরে বিরোধী ভাবাপন্ন (সরকার বিরোধী নয়, দেশবিরোধী, যারা বিভিন্ন ভাবে এই যুদ্ধে সেনাবাহিনীর বিরোধিতা করে, ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে অর্থনৈতিক সাহায্য দেয়) লোকদের প্রতি আরও কঠোর হবে প্রশাসন। একই ভাবে পশ্চিমা পন্থী যেসব আমলারা বিভিন্ন ভাবে যুদ্ধের গতিকে বাধাগ্রস্থ করে তাদের প্রতিও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যদিকে অনেকে মনে করে ঘাঁটে এসে ঘোড়া বদল করতে নেই, তাই যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেনাবাহিনী বা প্রশাসনে বড় ধরণের পরিবর্তন না আনাই ভালো। এক কথায় এই বিদ্রোহ জনগণকে অনেক ভাবনার খোঁড়াক যুগিয়েছে।

যদিও আমেরিকা বলছে যে তারা প্রিগঝিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগে থেকেই জানত তবে কিছু কিছু কাজে মনে হয় সেটা ঘটে যাবার পরে তারা নিজেরাও অনেকটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। কারণ নাই নাই করেও রাশিয়া পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ এবং সেই অস্ত্রের দায়িত্ব কার হাতে থাকবে সেটা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রিগঝিনের চেয়ে পুতিনের হাতে যে পারমাণবিক অস্ত্র অনেক বেশি নিরাপদ সেটা বুঝতে তাদের অসুবিধা হয় বলে মনে হয় না।  শোনা যায় তারা ইউক্রেনের উপর চাপ সৃষ্টি করে এ সময় আক্রমণ না করার জন্য। তবে তারা এটাও স্বীকার করেছে যে বিদ্রোহের সময় ফ্রন্ট একটুও দুর্বল হয়নি। তবে বিভিন্ন অজুহাতে এখন নতুন উদ্যমে ইউক্রেনে অস্ত্র সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে। এক প্রশ্নের উত্তরে লাভরভ বলেছেন এই ঘটনা ইউক্রেনে তাদের লক্ষ্য অর্জনে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন ঘটায়নি। আমেরিকা বার বার এই বিদ্রোহ থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করছে বলে লাভরভ বলেছেন আমেরিকা বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অসংখ্য বার দেশে দেশে সরকার বদলে অংশ নিয়েছে, এমনকি উচ্চপদস্থ অফিসাররা এসব বলে গর্ব করেছেন। তাই তাদের বর্তমান অবস্থান আরও সন্দেহ জনক – “রান্না ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না”র মত।

খুব অল্প সময়ে প্রায় বিনা রক্তপাতে বিদ্রোহ দমন করে রাশিয়ার সমাজ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন শুধু বিচক্ষণতা নয়, শক্তির পরিচয় দিয়েছে, পরিচয় দিয়েছে ঐক্যের যদিও পশ্চিমা বিশ্ব এই বিদ্রোহকে দুর্বলতা বলে প্রচার করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার তাদের নীতি সঠিক বলে বর্ণনা করেছে। পুতিন কিছুদিন আগে ঘোষণা করেছেন যে পশ্চিমা বিশ্ব ও তাদের মিত্ররা রাশিয়ার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক, তথ্য ও প্রযুক্তিগত সমস্ত ধরণের ফ্রন্টে অলআউট যুদ্ধে নেমেছে। পশ্চিমা বিশ্ব যে ভেতর থেকে এদের দুর্বল করতে চায় সেটাও তারা জানে। এই বিদ্রোহের পরে প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই নিজেদের রণনীতি ও রণকৌশল নতুন করে পর্যালোচনা করা হবে বলে সবাই আশা করছে। এই ঘটনা যুদ্ধে নতুন গতি দেবে ও সেটা দ্রুত শেষ করার জন্য এদের উৎসাহিত করবে বলেও অনেকেই মনে করছে। মনে রাখা দরকার যে এই বিদ্রোহের বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা চলছে, চলছে অনুসন্ধান। এটা সহজ কাজ নয়। দ্রুত এর সমাধান করা সম্ভব নয়। সব কিছুই যে এখন প্রকাশিত হবে তাও নয়। অনেক কিছুই জড়িত রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাথে তাই সেগুলো দীর্ঘ সময় গোপন রাখা হবে। তাই অপেক্ষা করতে হবে তদন্ত কমিটির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান ও তার ভিত্তিতে বিচার বিভাগের রায়ের উপর। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা।

দেশে অনেকের সাথে কথা বলে মনে হয় তাদের ধারণা এই বিদ্রোহের ফলে পুতিনের অবস্থান দুর্বল হয়েছে এবং তিনি আত্মগোপন করে আছেন। প্রথমত শুরু থেকেই নিজ দায়িত্বে তিনি এই বিদ্রোহ মোকাবেলা করেছেন, এমনকি লুকাশেঙ্কো কথা বলার আগেই তিনি প্রিগঝিনের সাথে কথা বলেছেন সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে। বরং এত দ্রুত ও প্রায় বিনা রক্তপাতে বিদ্রোহ দমনের জন্য তাঁর অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। সেই সময় সর্বস্তরের মানুষের সমর্থনের কারণেই বিদ্রোহ বেশি দূর এগোয়নি। তিনি গত ২৮.০৬.২০২৩ ঈদ উপলক্ষ্যে দাগিস্তানের প্রাচীন শহর দেরবেন্ত যান। এটাও হয়তো প্রতীকী। ১৯৯৯ সালে ভ্লাদিমির পুতিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার পরে বাসায়েভের সন্ত্রাসী বাহিনী দাগিস্তানে আক্রমণ করে। তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কিছু দূরে সেনাদের কাছে যান, দেখা করেন। তাঁর সেই ভূমিকা সেনাদের মধ্যে, সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার আলো জাগায়। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর পরবর্তী যাত্রা। দেরবেন্তে তিনি সাধারণ মানুষের সাথে দেখা করেন, তাদের প্রশ্নের উত্তর দেন, সেলফি তুলেন। তাই তাঁর আত্মগোপনের খবর নিতান্তই উর্বর মস্তক প্রসূত।

অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে ভাগনারের কি হবে? ভাগনারের একটা অংশ, যারা রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করতে চায় না, বেলারুশ যাবে। এ নিয়ে পোল্যান্ড বিভিন্ন কথা তুলেছে। বলতে চাইছে এরা পোল্যান্ড আক্রমণ করবে। তবে সেরকম কোন প্ল্যান এদের নেই। যতদূর জানা যায় সেই সেনাদের অভিজ্ঞতা বেলারুশ কাজে লাগাতে চায়। ফলে বেলারুশ সেনাদের সাথে তাদের যৌথ প্রশিক্ষণের সম্ভাবনা আছে। বিশেষ করে আগামী বছর সেখানে নির্বাচন। তখন পশ্চিমা দেশগুলো যাতে কোন ধরণের ঝামেলা না করতে পারে ভাগনারের উপস্থিতি  কিছুটা হলেও সেটার নিশ্চয়তা দিতে পারে।

কেন প্রিগঝিন এই ধরণের কাজ করল তার কিছু কিছু আভাস পাওয়া গেছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যুদ্ধরত সমস্ত গ্রুপ ও সেনাদের তাদের সাথে চুক্তি করার নির্দেশ দেয়। অন্য সবাই সেটা করলেও প্রিগঝিন সেটা করতে অস্বীকার করে। মূল কারণ এতে শুধু বেতন আর ইনস্যুরেন্স নয়, তার কোম্পানি বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহ করে যে অর্থ পেত সেটাও বন্ধ হয়ে যেত। আর এটা বিলিয়ন ডলার। এটাই তাকে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে উৎসাহিত করে। কেন সাথে সাথে তাদের উড়িয়ে দেওয়া হয়নি? কারণ শুরু থেকেই কথাবার্তা চলছিল। ২৪ জুন রাত দুটোয় জেনারেল সুরাভিকিন সেই আহ্বানই জানান। একই সাথে বিভিন্ন জায়গার সৈন্য মোতায়েন করে তাদের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এমনকি কিছু প্রিভেন্টিভ আক্রমণ করা হয় এটা বোঝানোর জন্য যে কোন অবস্থাতেই তাদের বিদ্রোহ সফল হবে না, প্রয়োজনে সমস্ত গ্রুপ উড়িয়ে দেওয়া হবে। শুধুমাত্র তখনই প্রিগঝিন লুকাশেঙ্কোর সাথে সমঝোতায় আসে।

গবেষক, জয়েন্ট ইনস্টিটিউট ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ
শিক্ষক, রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি, মস্কো